সম্মিলিত মুনাজাত এর শর’ঈ বিধান

সম্মিলিত মুনাজাত এর শর’ঈ বিধান।

মুনাজাতের স্বপক্ষে হাদীস বিশারদগণের রায়

১। জগত বিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন, “যে সকল নামাযের পর সুন্নাত নামায নেই, সে সকল ফরজ নামাযের পর ইমাম ও মুক্তাদীগণ আল্লাহর যিকিরে মশগুল হবেন। অতঃপর ইমাম কাতারের ডান দিকে মুখ করে দু‘আ করবেন। তবে সংক্ষিপ্তভাবে মুনাজাত করতে চাইলে কিবলার দিকে মুখ করেও করতে পারেন।”(ফাতহুল বারী ২: ৩৯০পৃঃ)

وأما الصلاۃ التي لایتطوع بعدہا فیتشاغل الإمام ومن معہ بالذکر الماثور ولا یتعین لہ مکان بل إن شاء وا انصرفوا وذکروا وإن شاء وا مکثوا وذکروا، وعلی الثاني إن کان للإمام عادۃ أن یعلمہم أو یعظہم فیستحب أن یقبل علیہم بوجہہ جمیعا وإ کان لا یزید علی الذکر المأثور۰ فہل یقبل علیہم جمیعا أو یتفتل فیجعل یمینہ من قبل المأمو مین ویسارہ من قبل القبلۃ ویدعو الثاني ہو الذی جزم بہ أکثر الشافعیۃ، ویحتمل ان قصر زمن ذلک ان یستمر مستقبلا للقبلۃ (فتح الباری : ۲/۳۹۰)

২। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাদাতা আল্লামা বদরুদ্দীন ’আইনী রহ. বলেন,“এ হাদীস দ্বারা নামাযের পরে মুনাজাত করা মুস্তাহাব বুঝা যায়। কারণ-সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐ সময় দু‘আ কবুল হওয়ার বেশী সম্ভাবনা।” (উমদাতুল ক্বারী ৬:১৩৯ পৃঃ)

ومن فوائد الحدیث ۔۔۔ منہا : فضل الذکر عقیب الصلاۃ بأنہا أوقات فاضلۃ ترجی منہا إجابۃ الدعاء (عمدۃ القاري : ۴/۶۱۳)

৩। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন, ‘নামাযের পরে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা বিদ‘আত নয়। কারণ-এ ব্যাপারে প্রচুর কাওলী রিওয়ায়াত বিদ্যমান। আমলী রিওয়ায়াতের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝে মধ্যে এ মুনাজাত করেছেন’ বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। আর এটাই সকল মুস্তাহাবের নিয়ম। তিনি নিজে মুনাসিব মত আমল বেছে নিতেন, আর অবশিষ্ট মুস্তাহাবসমূহের ব্যাপারে উম্মতদেরকে উৎসাহ দিতেন। সুতরাং এখন যদি আমাদের কেউ নামাযের পরে হাত উঠিয়ে দায়িমী (স্থায়ী) ভাবে মুনাজাত করতে থাকে, তাহলে সে ব্যক্তি এমন একটা বিষয়ের উপর আমল করল, যে ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উৎসাহ দিয়ে গেছেন। যদিও তিনি নিজে সর্বদা আমল করেননি।” (ফাইযুল বারী, ২:১৬৭ পৃঃ ও ৪৩১ পৃঃ/৪:৪১৭ পৃঃ)

۔۔۔لا أن الرفع بدعۃ فقد ہدي إلیہ في قولیات کثیرۃ، وفعلہ بعد الصلاۃ قلیلا، وہکذا شانہ في باب الأذکار والأوراد اختارہ صلی اللہ علیہ وسلم لنفسہ ما اختار اللہ لہ صلی اللہ علیہ وسلم وبقي أشیاء رغب فیہا الأمۃ، فإن التزم أحد منا الدعاء بعد الصلاۃ برفع الید فقد عمل بما رغب فیہ وإن لم یکثرہ لنفسہ، فاعلم ذلک۰ ( فیض الباري : ۲/۱۶۷)

৪। কুতুবুল আলম শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহ. বললেন,“ফরজ নামাযের পরে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করাকে কিছু লোক অস্বীকার করে থাকে। কিন্তু তা ঠিক নয়। কারণ-এর ব্যাপারে প্রচুর হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। এ সকল হাদীস দ্বারা নামাযের পর মুনাজাত করা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়”। (আল-আবওয়াব ওয়াত-তারাজিম ৯৭ পৃঃ)

৫। সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা ইউসুফ বিন্‌নূরী রহ. মুনাজাত সম্পর্কিত হাদীসসমূহ উল্লেখ পূর্বক বলেন, “মুনাজাত অধ্যায়ে যে সকল হাদীস পেশ করা হল, এগুলোই যথেষ্ট প্রমাণ যে, ফরজ নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত জায়িয। এ হাদীস সমূহের ভিত্তিতেই আমাদের ফুক্বাহা কেরাম উক্ত মুনাজাতকে মুস্তাহাব বলেছেন। (মা’আরিফুস সুনান : ৩:১২৩ পৃঃ)

فہذہ وما شاکلہا من الروایات في الباب تکاد تکفي حجۃ لما اعتادہ الناس فی البلاد من الدعوات الاجتماعیۃ دبر الصلوات ۰۰۰(معارف السنن : ۳/۱۲۳)

৬। মুসলিম শরীফের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাকার আল্লামা নববী রহ. বলেন, “সকল ফরজ নামাযের পরে ইমাম, মুক্তাদী ও মুনফারিদের জন্য দু‘আ করা মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।” (শারহে মুহাযযাব লিন-নাওওয়াবী ৩:৪৬৯)

قد ذکرنا استحباب الذکر والدعاء للإمام والمأموم والمنفرد وہو مستحب عقب کل الصلوات بلا خلاف۔۔۔ ۰ (شرح المہذب للنووي : ۳/۴۶۹)

৭। প্রখ্যাত হাদীস সংকলক হযরত মাওলানা জাফর আহমাদ উসমানী রহ. বলেন, “আমাদের দেশে যে সম্মিলিত মুনাজাতের প্রথা চালু আছে যে, ইমাম সাহেব নামাযের পর কেবলামুখী বসে দু‘আ করে থাকেন, এটা কোন বিদ‘আত কাজ নয়। বরং হাদীসে এর প্রমাণ রয়েছে। তবে ইমামের জন্য উত্তম হলো-ডানদিক বা বামদিকে ফিরে মুনাজাত করা।” (ই’লাউস সুনান ৩:১৬৩, ৩:১৯৯ পৃঃ)

তিনি আরো বলেন, “হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হল যে, প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা মুস্তাহাব। যেমন- আমাদের দেশে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে প্রচলিত আছে।” (ঐ ৩:১৬৭ পৃঃ, ৩:২০৪)

এর পর তিনি নামাযের পর মুনাজাত অস্বীকারকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। (৩: ২০৩)

قلت والحاصل أن ما جرئ بہ العرف في دیارنا من أن الإمام یدعو فی دبر بعض الصلواش مستقبلا للقبلہ لیس ببد عۃ بل لہ أصل فی السنۃ، وإن کان الأولی أن ینحرف الإمام بعد کل صلاۃ یمینا أو یسارا ۔۔۔۰ (إعلاء السنن : ۳/۱۹۹)

তেমনিভাবে ফকীহুন নফ্‌স হযরত মাওলানা মুফতী রশীদ আহমদ গাংগুহী (রাহঃ)ও মুনাজাত অস্বীকারকারীদের সমালোচনা করেছেন। (আল কাওকাবুদ্দুররী- ২ : ২৯১)

মুহাদ্দিসীনে কিরামের বর্ণিত এ রায়সমূহ দ্বারা বুঝা গেলঃ

(ক) সকল নামাযের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা মুস্তাহাব। এ সময় দু‘আ কবুল হওয়ার খুবই সম্ভাবনা।

(খ) মুনাজাত ইমাম-মুক্তাদী; মুনফারিদ সকলের জন্যই মুস্তাহাব আমল।

(গ) ফরয নামাযের পর ইমাম-মুক্তাদী সকলের ইজতিমায়ী মুনাজাত করা মুস্তাহাব।

(ঘ) ফরয নামাযের পর মুস্তাহাব মনে করে দায়িমীভাবে মুনাজাত করলেও কোন ক্ষতি নেই।

(ঙ) নামাজের পর মুনাজাত কোন ক্রমেই বিদ‘আত নয়। বহু কাওলী হাদীস দ্বারা এ মুনাজাত ছাবেত আছে। মুস্তাহাব আমল হেতু রাসূল ﷺ নিজে যদিও তা মাঝে মধ্যে করেছেন, কিন্তু সকলকে তিনি এর প্রতি মৌখিকভাবে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছেন।

(চ) প্রচলিত মুনাজাতকে বিদ‘আত বলা বা বিরোধিতা করা হঠকারিতার শামিল। প্রচলিত মুনাজাত মুস্তাহাব। সকল মাযহাবেই এ মুনাজাত মুস্তাহাব সাব্যস্ত হয়েছে।”(প্রমাণের জন্য হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদুল মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ.এর প্রসিদ্ধ ফাতওয়া দ্রষ্টব্য পৃঃ ১/৭৯৬)