সম্মিলিত মুনাজাত এর শর’ঈ বিধান।

সম্মিলিত মুনাজাত এর শর’ঈ বিধান।

মুনাজাতের স্বপক্ষে ফিকহের কিতাবসমূহের দলীল

ফিকহের কিতাবসমূহে মুনাজাতের স্বপক্ষে বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। নিম্নে তার কিয়দাংশ উদ্ধৃত হল

(۱)قال في شرعۃ الإسلام : ویغتنم أي المصلي الدعاء بعد المکتوبۃ

(۲)في مفاتیح الجنان : قولہ بعد المکتوبۃ أي قبل السنۃ، کذا في السعایۃ

(۳)في نور الإیضاح وشرحہ المسمی بإمداد الفتاح ثم بعد الفراغ عن الصلاۃ یدعو الإمام لنفسہ وللمسلمین رافعي أیدیہم حذو الصدور وبطونہا مما یلی الوجہ بخشوع وسکون ثم یمسحون بہا وجوہہم في اخرہ ای عند الفراغ من الدعاء۰ انتہی۰ کذا في التحفۃ المرغوبۃ والسعایۃ۰

(۴)قد أجمع العلماء علی استحباب الذکر والدعاء بعد الصلاۃ وجائت فیہ أحادیث کثیرۃ۰ انتہی (تہذیب الأذکار للرملي کذا في التحفۃ المرغوبۃ)

(۵)۔۔۔ أي اذکروا اللہ تعالی وادعوا بعد الفراغ من الصلاۃ۰
(فتاوي صوفیہ کذا في التحفۃ)

(۶)إن الدعاء بعد الصلاۃ المکتوبۃ مسنون وکذا رفع الیدین ومسح الوجہ بعد الفراغ۰ (منہج العمال والعقائد السنیۃ کذا في التحفۃ) بحوالہ کفایت المفتي : ۳/

১। ফিকহে হানাফীর অন্যতম মুল কিতাব ‘মাবসূত’-এর বর্ণনাঃ…..“যখন তুমি নামায থেকে ফারিগ হবে, তখন আল্লাহর নিকট দু‘আয় মশগুল হয়ে যাবে। কেননা-এ সময় দু‘আ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।”

২। প্রসিদ্ধ ফিকহের কিতাব ‘মিনহাজুল উম্মাল ও আকায়িদুছ ছুন্নিয়্যাহ এর বর্ণনাঃ “ফরজ নামাযের পর দু‘আ করা সুন্নত। অনুরূপভাবে দু‘আর সময় হাত উঠানো এবং পরে হাত চেহারায় মুছে নেয়াও সুন্নত।”

৩। …….‘আততাহজীবুল আজকার’-এর বর্ণনা,“এ কথার উপর উলামাগণের ইজমা হয়েছে যে, নামাযের পর যিকর ও দু‘আ করা মুস্তাহাব।”

৪। ……….‘শির’আতুল ইসলাম’ এর বর্ণনা, “ফরয নামাযের পর মুসল্লীরা দু‘আ করাকে গণিমত মনে করবে।”

৫। ………‘তুহফাতুল মারগুবা’ ও ‘সি’আয়া’-এর বর্ণনাঃ “নামাজ শেষে ইমাম ও মুসল্লীগণ নিজের জন্য এবং মুসলমানদের জন্য হাত উঠিয়ে দু‘আ করবেন। অতঃপর মুনাজাত শেষে হাত চেহারায় মুছবেন।” (তুহ্‌ফা পৃঃ ১৭)

৬। ……….. ‘ফাতাওয়া বাজ্জাজিয়া’-এর বর্ণনাঃ নামায শেষে ইমাম প্রকাশ্যভাবে হাদীসে বর্ণিত দু‘আ পড়বেন এবং মুসল্লীগণও প্রকাশ্য আওয়াজে দু‘আ পড়বেন। এতে কোন অসুবিধা নেই। তবে মুসল্লীদের দু‘আ ইয়াদ হয়ে যাওয়ার পর সকলে বড় আওয়াজে দু‘আ করা বিদ‘আত হবে। তখন মুসল্লীগণ দু‘আ আস্তে পড়বেন।

৭। ‘নূরুলঈযাহ’-এর বর্ণনাঃ “নামাযের পরে জরুরী বা ওয়াজিব মনে না করে হাত উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে আল্লাহর নিকট দু‘আ করা মুস্তাহাব।” (নূরুল ঈযাহ পৃঃ ৮২)

উল্লেখিত বর্ণনাসমূহ দ্বারা স্পষ্টতঃ প্রমাণিত হলো যে, নামাযের পর দু‘আ করা মুস্তাহাব। আর তা বিভিন্ন হাদীসে দু‘আর আদব হিসাবে হাত উঠাতে উৎসাহিত করার আলোকে হাত উঠিয়ে করা বাঞ্ছনীয়। আরো প্রমাণিত হল যে, মুনাজাত করা ইমাম-মুক্তাদী সবার জন্যই পালনীয় মুস্তাহাব আমল।

মুনাজাত অস্বীকারকারীগণের কতিপয় অভিযোগ ও তার জাওয়াব

অভিযোগ-১
বর্ণিত হাদীসমূহ সম্পর্কে ফরয নামাযের পর মুনাজাত ভিত্তিহীন হওয়ার দাবীদারগণ আপত্তি তুলেন যে, ‘এ হাদীসমূহের কোন একটিতেও ফরয নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত করার কথা উল্লেখ নেই। কেননা, এগুলোর কোনটিতে শুধু দু‘আর কথা আছে, কিন্তু হাত তোলার কথা নেই। আবার কোনটিতে শুধু হাত তোলার কথা আছে, কিন্তু তা একাকীভাবে, সম্মিলিতভাবে নয়। আবার কোনটিতে সম্মিলিত মুনাজাতের কথা আছে; কিন্তু ফরয নামাযের পরে হওয়ার কথা উল্লেখ নেই। অতএব, এ হাদীসসমূহ দ্বারা প্রচলিত সম্মিলিত মুনাজাত প্রমাণিত হয় না!!

জবাব-১
তাদের অভিযোগের ভিত্তিই সহীহ নয়। কারণ শরীয়তে এমন কোন বিধান নেই যে, প্রত্যেকটা ইবাদতের সকল অংশ কোন একটা আয়াত বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। নতুবা তা অগ্রহণযোগ্য হবে। তাদের এ আপত্তির জবাবে হযরত মাওলানা মুফতী কিফায়াতুল্লাহ রহ. মুফতী আজম হিন্দুস্তান “কিফায়াতুল মুফতী” গ্রন্থে বলেন- “বিষয়গুলো যেমন কোন এক হাদীসে একত্রিতভাবে উল্লেখিত হয়নি, তেমনি কোন হাদীসে তা নিষিদ্ধও হয়নি। কোন জিনিসের উল্লেখ না থাকার দ্বারা তা নিষিদ্ধ হওয়া বুঝায় না। সুতরাং এ কথা বলা যাবে না যে, এ সব হাদীস নামাযের পরের দু‘আর জন্য প্রযোজ্য নয় বরং উল্লেখিত হাদীসমূহের বর্ণনা ভাব এমন ব্যাপকতা সম্পন্ন, যা সম্ভাব্য সকল অবস্থাকেই শামিল করে। তা ছাড়া বিভিন্ন রিওয়ায়াতে এ অবস্থাগুলোর পৃথক পৃথক উল্লেখ রয়েছে-যার সমষ্টিগত সামগ্রিক দৃষ্টিকোণে ফরজ নামাযের পর হস্ত উত্তোলন পূর্বক সম্মিলিত মুনাজাত অনায়াসে সাবিত হয়। এটা তেমনি, যেমন নামাযের বিস্তারিত নিয়ম, আযানের সুন্নত নিয়ম, উযূর সুন্নাত তরীকা ইত্যাদি একত্রে কোন হাদীসে বর্ণিত নেই। বিভিন্ন হাদীসের সমষ্টিতে তা সাবিত হয়” তারপরেও তা সকল উলামাদের নিকট গ্রহণযোগ্য। (দেখুনঃ কিফায়াতুল মুফতী, ৩:৩০০ পৃঃ)

অভিযোগ-২
নামাযের পর মুনাজাতের স্বপক্ষে হাদীসমূহ কেবল নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অতএব, এর দ্বারা ফরয নামাযের পর মুনাজাত মুস্তাহাব হওয়া প্রমাণিত হয় না।

জবাব-২
বর্ণিত হাদীসসমূহের কয়েকটিতে ফরয নামাযের কথা উল্লেখ আছে। আর কয়েকটির মধ্যে “প্রত্যেক নামাযের পর” কথাটির উল্লেখ আছে। যার মধ্যে ফরয ও নফল সবই শামিল। সুতরাং এ প্রশ্নই অবান্তর। তাদের এ প্রশ্নের জওয়াবে হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলেন, “নামাযের পর মুনাজাত করার পক্ষের হাদীসগুলোর ব্যাপারে ফিকাহবিদগণ নফল এবং ফরয উভয় নামাযকেই শামিল করেছেন।” (ফাইযুল বারী, ৪:৪৭ পৃঃ)

মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী রহ. বলেন, “ফরজ নামাযের পর মুনাজাত নফল নামাযের অপেক্ষা উত্তম।”(ই’লাউস সুনান, ৩:১৬৭ পৃঃ)

সুতরাং কিছুক্ষনের জন্য যদি মেনে নেয়া হয় যে, উক্ত হাদীসসমূহে নফল নামাযের পর মুনাজাত করতে বলা হয়েছে তাহলে উক্ত কথার দ্বারা ফরজ নামাযের পর মুনাজাত আরো উত্তমভাবে প্রমাণিত হবে। এ কারণে যে, নফল নামাযের পর দুআ কবূল হওয়ার কোন ঘোষণা করা হয় নাই, আর ফরয নামাযের পর দুআ কবূল হওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। তো যে ক্ষেত্রে কবুল হওয়ার ঘোষণা নেই, সে ক্ষেত্রে যদি দু‘আ ও মুনাজাত করতে হয় তাহলে যেখানে দু‘আ কবুল হওয়ার ঘোষণা আছে সেখানে অবশ্যই দু‘আ করা কর্তব্য। সুতরাং উক্ত অভিযোগ দ্বারা ফরয নামাযের পরে মুনাজাতকে অস্বীকার করা যায় না।

অভিযোগ-৩
মুনাজাত মুস্তাহাব হয়ে থাকলে, প্রচুর হাদীসে এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ হতে আমল সাবিত থাকতো। অথচ এ ব্যাপারে একটি আমলী রিওয়ায়াতও সাবিত নেই।

জবাব-৩
প্রথমতঃ মুনাজাতের ব্যাপারে ‘রাসূল ﷺ-এর আমল সম্পর্কিত একটি রিওয়ায়াতও সাবিত নেই’-এ কথাটি সম্পূর্ণ গলদ। কারণ এ প্রসঙ্গে অনেকগুলো স্পষ্ট রিওয়ায়াত দ্বারা আমরা রাসূল ﷺ-এর আমল অধ্যায়ে রাসূল ﷺ-এর মুনাজাত করার হাদীস বর্ণনা করেছি। দ্বিতীয়তঃ মুস্তাহাব আমল প্রমাণের জন্য রাসূল ﷺ-এর কওলী বা মৌখিক হাদীস যথেষ্ট, নবী কারীম ﷺ-এর আমল এর মাধ্যমে সাবিত হওয়া মোটেই জরুরী নয়। কারণ-বহু মুস্তাহাব আমল এমন রয়েছে, যা রাসূলে পাক ﷺ বিশেষ হিকমতের কারণে বা সুযোগের অভাবে নিজে করতেন না, কিন্তু সে সবের প্রতি মৌখিকভাবে উম্মতদেরকে উৎসাহ দিতেন। যাতে উম্মত তা আমল করে নিতে পারে। যেমন তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায, চাশতের নামায, আযান দেয়া যাকে আফজালুল আ’মাল বলা হয়ে থাকে ইত্যাদি। এগুলো রাসূলে পাক ﷺ থেকে আমল করার মাধ্যমে সাবিত নেই। অথচ তিনি এসব নেক কাজসমূহের প্রতি উম্মতকে মৌখিকভাবে যথেষ্ট উৎসাহিত করে গিয়েছেন। সকল উলামায়ে কেরাম এগুলোকে মুস্তাহাব আমল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তদ্রূপ মুনাজাতের ব্যাপারে রাসূলে করীম ﷺ হতে আমলী রিওয়ায়াত স্বল্প বর্ণিত হলেও মৌখিক রিওয়ায়াত প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। অতএব, মুস্তাহাব প্রমাণ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন, যারা বলে থাকেন যে, মুস্তাহাব প্রমাণ হওয়ার জন্য রাসূলে পাক ﷺ-এর মৌখিক বর্ণনার পাশাপাশি আমলও থাকতে হবে, তারা সঠিক সরল পথ থেকে দূরে সরে পড়েছেন এবং একটি ফাসিদ ও গলদ জিনিসের উপর ভিত্তি করে কথা বলেছেন। (দ্রষ্টব্যঃ ফাইযুল বারী, ২:৪৩১ পৃঃ)

অভিযোগ-৪
মুনাজাতের স্বপক্ষে যে সকল হাদীসের উদ্ধৃতি দেয়া হয়, তার অনেকটাই জ’য়ীফ। অতএব, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

জবাব-৪
এ অধ্যায়ের অনেক সহীহ হাদীসের পাশাপাশি কিছু হাদীস জ’য়ীফ থাকলেও যেহেতু তার সমর্থনে অনেক সহীহ রিওয়ায়াত বিদ্যমান রয়েছে, অতএব, তা নির্ভরযোগ্যই বিবেচিত হবে।

দ্বিতীয়তঃ সেই হাদীসসমূহ ফজীলত সম্পর্কে। আর ফজীলতের ব্যাপারে জ’য়ীফ হাদীসও গ্রহণযোগ্য। (দেখুনঃ আল আযকার লিন নববী পৃঃ ৭-৮, তাদরীবুর রাভী লিস সুয়ূতী পৃঃ ১৯৬, কিতাবুল মাউযূআত লি মুল্লা আলী ক্বারী পৃঃ ৭৩)

অভিযোগ-৫
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি ফরজ নামাযের পর যখন সালাম ফিরাতেন, তখন এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়তেন যে, মনে হতো-তিনি যেন উত্তপ্ত পাথরের ওপর উপবিষ্ট ছিলেন। (উমদাতুল কারী, ৬:১৩৯ পৃঃ)

এতে বুঝা যায়, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. সালাম ফিরিয়ে মুনাজাত না করেই দাঁড়িয়ে যেতেন।

জবাব-৫
হযরত আবু বকর সিদ্দীক
রা.-এর উল্লেখিত আমলের এ অর্থ নয় যে, তিনি সালাম ফিরানোর পর মাসনূন দু‘আ-যিকর না করেই দাঁড়িয়ে যেতেন। কেননা-তিনি রাসূলে পাক ﷺ-এর বিরুদ্ধাচরণ কখনও করতে পারেন না। রাসূলে পাক ﷺ হতে সালাম ফিরানোর পর দু‘আ যিকর এর কথা প্রচুর হাদীসে বর্ণিত আছে। সুতরাং রিওয়ায়াতটির সঠিক মর্ম হল-হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. সালাম ফিরানোর পর সংক্ষিপ্ত দু‘আ-যিকর পাঠের অধিক সময় বসে থাকতেন না।

অতএব, উল্লেখিত রিওয়ায়াত দ্বারা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর মুনাজাত করা ব্যতীত উঠে পড়া প্রমাণিত হয় না। (আল আবওয়াব ওয়াত তারাজিম, ৯৭ পৃঃ)