ঈদের নামাযে ছয় তাকবীর!

মুফতি রফিকুল ইসলাম আল-মাদানী,
আলেম, লেখক, গবেষক ও ওয়ায়েজ,

মহানবী স.ও সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং মুসলিম মিল্লাতের দেড় হাজার বছরের ইজমার আলোকে ঈদের নামাজে অতিরিক্ত তাকবীর হবে ছয়টি।

আব্দুর রহমান কাসেম থেকে বর্ণিত জনৈক সাহাবী বলেন ঈদের দিন রাসুলুল্লাহ স.আমাদের ঈদের নামাজ পড়ান এর প্রতি রাকআতে তিনি চারটি করে তাকবীর প্রদান করেন । নামাজ শেষে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন ভুলে যেওনা। জানাজার নামাজের তাকবীরের মত চারটি করে তাকবীর হবে । বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ করে তিনি অবশিষ্ট চারটি আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করেন। তাহাবী 4/345 মিসরী হা. 1/659

উল্লেখ্য যে এই হাদীসে প্রথম রাকআতের চারটি তাকবীরে তাকবীরে তাহরিমা ব্যতীত অতিরিক্ত তিনটি এবং দ্বিতীয় রাকআতে রুকুর তাকবীর ব্যতীত অতিরিক্ত তিনটি তাকবীরে ঈদের নামাজ হবে । অতএব 3 + 3= অতিরিক্ত তাকবীর হয় 6টি।
ইমাম তাহাবী বলেন হাদীসের সনদ হাসান ।
তাহাবী 4/345

সাঈদ ইবনুল আস থেকে বর্ণিত তিনি সাহাবী আবু মূসা আশআরী ও হুজাইফা র.কে জিজ্ঞেস করেন রাসূলুল্লাহ স. ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের নামাজে কত তাকবীর দিতেন ? উত্তরে তিনি বলেন জানাজার নামাজের তাকবীর এর সমসংখ্যক তাকবীর দিতেন। তখন হুজাইফা বলেন ঠিক বলেছেন আবু মুসা আরো বলেন আমি যখন বসরায় গভর্নর হিসেবে ছিলাম ঈদের নামাজে এভাবে চার তাকবীর দিতাম। আবু আয়েশা বলেন এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাঈদ এর সঙ্গে আমিও ছিলাম। ইবনে আবী শাইবার বর্ণনায় উল্লেখ আছে ঈদের নামাজে জানাযার নামাযের মত চার তাকবীর হবে বাক্যটি আমি আজও ভুলিনি । আবু দাউদ 1/682 হা. 1153 মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা 1/494 হা.5694 আহমদ 4/416 হা.19 734

ইমাম নিমবী সহ হাদীস বিশারদ ইমামগণ বলেছেন হাদীসটি হাসান । আসারুস সুনান, পৃষ্ঠা 259

এছাড়া ইবনে মাসউদ ইবনে আব্বাস মুগীরাহ ও আনাস রা. এবং বাইয়াতে রিদওয়ান এর সাহাবীগণ ঈদের নামাজ অতিরিক্ত ছয়টি তাকবীরে পড়েছেন।
দেখুন, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক 3 / 293 হা . 5686 তাবরানী কাবীর 9/352 হা. 9517 মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা 4 / 95 হা. 5707

সাহাবাগণ থেকে বর্ণিত উল্লিখিত অনেক হাদীসকে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী ইমাম ইবনে হাযম এবং লামাজহাবী আলেম নাসিরুদ্দিন-আলবানী বিশুদ্ধ ও সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন ।দেখুন আদ দিরায়া 1/220 মুহাল্লা 3/295 ইরওয়াওল গালীল 3 / 111 হাদীস নং 639

ছয় তাকবীরে ঈদের নামাজ এ প্রসঙ্গে সাহাবাগণের আমল বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত আছে। এভাবে বিশুদ্ধ সনদে সাহাবাগণ থেকে ছয় তাকবীরে ঈদের নামাজের উপরে ইজমাও বর্ণিত আছে। দেখুন তাহাবী 1/496 হা. 2611 বর্ণনাটি সহীহ।

12 তাকবীরে ঈদের নামাজের আমলযোগ্য কোনো হাদীস নেই। এ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের বই পুস্তুত পাওয়া যায়। এতে 12 তাকবীরের অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করে থাকে। আমি এসব উল্লেখ করে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন মনে করিনা এবং আমি নিজে এ ব্যাপারে কোনো মতামত দিতে চাইনা । প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম তিরমিজি রহ. এর মতামতটা উল্লেখ করেই এ বিষয়ে ইতি টানবো। 12 তাকবীর বিষয়ে তিনি একটা হাদীস উল্লেখ করেছেন

عن كثير بن عبد الله عن ابيه عن جده ان النبي صلى الله عليه وسلم كبر في العيدين في الاولى سبعا قبل القراءه وفي الاخره خمسا قبل القراءة

কাসীর তার পিতা আব্দুল্লাহ থেকে আর আব্দুল্লাহ কাসীরের দাদা আমর বিন আউফ থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ স. ঈদের নামাজে প্রথম রাক আতে কেরাতের পূর্বের সাতটি তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাক আতে কেরাতের পূর্বে পাঁচটি তাকবীর দিতেন।

এ হাদীসটি ইমাম তিরমিজি উল্লেখ করার পর হাদীসের ব্যাপারে মন্তব্য তিনি নিজেই লিখে দিয়েছেন

حديث جد كثير حديث حسن وهو احسن شيء روي في هذا الباب عن النبي صلى الله عليه وسلم

কাসীর তার দাদা থেকে বর্ণিত 12 তাকবীরের হাদীসটি ভালো। এই হাদীসটি 12 তাকবীর বিষয়ে বর্ণিত হাদীসের জগতে সবচেয়ে ভালো হাদীস।
তিরমিজি 1 119 হা 536

12 তাকবীরের যতগুলো হাদীস বর্ণিত আছে তন্মধ্যে উল্লিখিত হাদীসটিকে ইমাম তিরমিজি তুলনামূলক সর্বাপেক্ষা ভালো বলেছেন। অতএব এই হাদীসের অবস্থা বোঝা গেলেই অন্যান্য হাদীসের অবস্থা বোঝা যাবে। তাই আমরা এই হাদীসের বর্ণনাকারী সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের কি মতামত আলোচনা করব।

12 তাকবীরে ঈদের নামাজের এই হাদীসের বর্ণনাকারী কাসীর ইবনে আব্দুল্লাহ সম্পর্কে

ইমাম আবু দাউদ বলেন هو احد الكذابين
সে মিথ্যুকদের একজন। তাহজিবুল কামাল 24/ 138 (4948)

ইমাম শাফী বলেন،
هو ركن من اركان الكذب
সে মিথ্যার স্তম্ভ সমূহের একটি স্তম্ভ। ইরওয়াওল গালীল আলবানী 3/ 109

ইমাম নাসায়ী ও দারাকুতনি বলেন
متروك الحديث
সে হাদীসের জগতে পরিত্যক্ত। যুয়াফা ওয়াল মাতরূকীন। পৃষ্ঠা 205 জীবনী 529

ইমাম তিরমিজির মতে12 তাকবীরের এই হাদীসটি হল 12 তাকবীর বিষয়ে বর্ণিত সব হাদীসের তুলনায় ভালো হাদীস । আর এই হাদীসের অবস্থা হলো মিথ্যুক, মিথ্যার স্তম্ভ ও পরিত্যাগ যোগ্য বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিত। এবার পাঠকগণ চিন্তা করেন 12 তাকবীরের বিষয়ে বর্ণিত অন্যান্য হাদীসের অবস্থা কি হবে!

বিস্তারিত জানার জন্য আমার লেখা বই ” ঈদের নামাজে ছয় তাকবীর কেন ” পড়তে পারেন।

মুফতী রফিকুল ইসলাম আল মাদানী
ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ
বসুন্ধরা ঢাকা

.

Previous articleযাকাত না দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি
Next articleজীবনজুড়ে রমজান
নামঃ- নাজমুল হাসান সাকিব বিন মুজিবুর রহমান স্থায়ী ঠিকানাঃ- বাহেরবালী, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানাঃ- বসুন্ধরা, বারিধারা, ঢাকা ১২২৯ পড়াশোনাঃ- বাহেরবালী দারুল উলূম নূমানিয়া মাদরাসা, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। (নূরানী টু হেদায়াতুন্নাহ্) জামিয়াতুস সালাম মদিনাবাগ, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। (কাফিয়া-শরহে বেকায়া) মারকাজুল উলূম আল-ইসলামিয়া মান্ডা, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। আরবী স্নাতক ৪র্থ বর্ষ মদিনাতুল উলূম বসুন্ধরা মাদরাসা ( হেদায়া) মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা। (এম এ- মাস্টার্স) পেশাঃ- পড়াশোনা (ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনো অধ্যায়ণরত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here