ইবলিসের মরণ হবে যেভাবে – বিস্তারিত দেখুন ।

আল্লাহর কাছে যে যত সৎ তার মৃত্যুটা ততটা সহজ ভাবে হবে। আর যে যত নিকৃষ্ট তার মৃত্যুটাও তত নিকৃষ্টভাবেই হবে। ইবলিসের কুমন্ত্রণার কারণে কত বনি আদম যে জাহান্নামে যাবে তার কোনো হিসাব নাই।
আজকের প্রবন্ধে আমরা ইবলিসের মৃত্যু কিভাবে হবে সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো।

হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস রহঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ওমর ইবনে খাত্তাব রাঃ এর সাথে সাক্ষাৎ করতে মদিনায় আসলাম। দেখতে পেলাম অনেক মানুষ জমায়েত হয়ে আছে, একটু অগ্রসর হয়ে দেখতে পেলাম কা’ব আহবার রাঃ হাদিস বর্ণনা করছেন। আমি উনার মজলিসে বসে পড়লাম, হাদিস শুনার জন্য। তিনি বলছেন, আদম আঃ এর ওফাতের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার শত্রু আমাকে মৃত অবস্থায় দেখে ভীষণ আনন্দিত হবে। কারণ, তাকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেওয়া হয়েছে।


তখন তাকেঁ বলা হল, হে আদম! তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। আর অভিশপ্ত ইবলিসকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে, যেন সে পূর্ব ও পরবর্তী সকল মানুষের মৃত্যুর যন্ত্রণা একাই ভোগ করতে পারে।

তারপর হযরত আদম আঃ আযরাইলকে বললেন, ইবলিস কিভাবে মৃত্যুবরণ করবে, বিস্তারিত আমার নিকট বর্ণনা করুন। আযরাইল আঃ তা বর্ণনা করলেন। হযরত আদম আঃ বললেন, যথেষ্ট হয়েছে।

তখন সমবেত লোকেরা আওয়াজ করে বলল, হে আবু ইসহাক! আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। কিভাবে ইবলিস মৃত্যুর-যন্ত্রণা ভোগ করবে, তা কি আমাদের নিকট বর্ণনা করে শুনাবেন? কা’ব রাঃ বলতে অস্বীকার করলেন। লোকেরা পীড়াপীড়ি করলে , তখন তিনি রাযী হলেন। আর বলতে লাগলেন, যখন দুনিয়া ধ্বংসের সময় এসে যাবে এবং শিঙ্গায় ফুৎকারের সময় নিকটবর্তী হয়ে যাবে, তখন লোকেরা বাজারে ঝগড়া করতে থাকবে, ক্রয়-বিক্রয়ে লিপ্ত থাকবে, বিভিন্ন ধরনের গল্পগুজব, আড্ডা ও খেলা-ধুলায় সময় কাটাতে থাকবে।

হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। প্রায় তিনদিন পর্যন্ত তারা বেহুশ হয়ে পড়ে থাকবে। আর বাকী অর্ধেক মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে বিমূঢ়-বিহ্বল অবস্থায় দাড়িয়ে থাকবে, যেমন ভীতু মেষ, হিংস্র প্রাণী দেখলে বিমূঢ়-বিহ্বল হয়ে পড়ে। মানুষের যখন এই অবস্থায় থাকবে, তখন তারা আকাশ ও যমীনের মাঝে আরেকটি বিকট আওয়াজ শুনতে পাবে। ফলে দুনিয়ার সকল প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে। কোনো মানুষ, জ্বিন, শয়তান বা কোনো প্রাণী জীবিত থাকবেনা। আর এই সময়টিই হবে,মহান রাব্বুল আলামিন ও ইবলিসের মাঝে নির্ধারিত প্রতিশ্রুতির সময়।

তখন আল্লাহ তা’লা মালাকুল মউত আযরাইলকে বলবেন, পূর্ব ও পরবর্তী সকলের সংখ্যা অনুযায়ী আমি তোমার সাহায্যকারী ফেরেশতা সৃষ্টি করিয়াছি। আর আমি তোমার মধ্যে আকাশের ও পৃথিবীর সকল অধিবাসীর শক্তি দান করিয়াছি। আমি আজ তোমাকে রাগ ও ক্রোধের পোশাক পরাবো।
সুতরাং আমার রাগ ও ক্রোধ নিয়ে বিতারিত অভিশপ্ত ইবলিসের কাছে যাও। তাকে মৃত্যুর স্বাধ উপভোগ করাও। পূর্ব ও পরবর্তী সকল জ্বিন ও ইনসানের মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করাও। তোমার সাথে জাহান্নামের সত্তর হাজার প্রহরী ফেরেশতাকে নিয়ে যাও। তারা যেন ক্ষিপ্ত ও ক্রুদ্ধ হয়। আর তাদের প্রত্যেকের সাথে আগুনের শিকল থাকবে।


সত্তর হাজার আগুনের আংটা দ্বারা তার অপবিত্র রুহকে টেনেহিঁচড়ে বের করবে। আর মালেক ফেরেশতাকে ডেকে বলে দাও, সে যেন জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়।

তারপর মালাকুল মউত আযরাইল আঃ এমন আকৃতি ধারণ নেমে আসবেন, যদি তা সপ্ত আকাশ ও সপ্ত যমীনের অধিবাসীগণ দেখতো, তাহলে ভয়ে আতঙ্কে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো।
মালাকুল মউত আযরাইল আঃ ইবলিসের নিকট পৌঁছে এমন এক ধমক দিবে, সে তাতে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়বে। এবং এমনভাবে চিৎকার করবে, যদি তা পূর্ব বা পশ্চিমের কেউ শুনতে পেত, জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে যেত।


মালাকুল মউত আযরাইল আঃ বলবেন, হে খবিশ! দাড়া, তুই যাদের বিভ্রান্ত করেছিস, তাদের সকলের মৃত্যুর যন্ত্রণা আজ তোকে ভোগ করতে হবে।
আর এটাই তোমার ও তোমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতির সময়। সুতরাং তুমি কোথায় পালাচ্ছো। ইবলিস তখন পালিয়ে পূর্ব প্রন্তে চলে যাবে। গিয়ে দেখবে তার সামনেই মালাকুল মউত আযরাইল আঃ উপস্থিত।
তখন সমুদ্রে ডুব দিয়ে, অতল গভীরে পৌঁছে যাবে, সেখানেও দেখবে মালাকুল মউত আযরাইল আঃ উপস্থিত। আর সমুদ্র তাকে যমীনে নিক্ষেপ করবে, তাকে গ্রহণ করবে না।

ইবলিস তখন দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পালাতে থাকবে। তার কোনো রক্ষাকারী থাকবেনা।তার কোনো আশ্রয় স্থল থাকবেনা, থাকবেনা কোনো উদ্ধারকারী। তারপর ইবলিস আদম আঃ এর কবরের সামনে দাড়িয়ে বলবে , হে আদম! শুধু তোমার কারণে আমি বিতারিত ও অভিশপ্ত হয়েছি।

হায়! তোমাকে যদি সৃষ্টি করা না হত! অতঃপর মালাকুল মউত আযরাইলকে বলবে, কোন ধরণের শাস্তি দ্বারা আমার রূহ কবয করবে?
মালাকুল মউত আযরাইল আঃ বলবেন, ‘লাযা’ জাহান্নামের শাস্তি দ্বারা, ‘সাকার জাহান্নামের শাস্তি দ্বারা, এবং ‘জাহীম’ জাহান্নামের শাস্তি দ্বারা। বরং এরচেয়ে আরো বহুগুণ বেশী শাস্তি দ্বারা। ইবলিস তখন একবার মাটিতে গড়াগড়ি খাবে। আবার চিৎকার করবে। আবার পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে, পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্তে ছুটে পালাবে। অবশেষে ঐ জায়গায় গিয়ে পৌঁছবে, যেখানে তাকে অভিশপ্ত হওয়ার দিন নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে জাহান্নামের প্রহরী ফেরেশতারা আগুনের আংটা নিয়ে প্রস্তুত থাকবে। পুরো পৃথিবী জলন্ত অঙ্গারের ন্যায় হয়ে যাবে। ফেরেশতারা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে এবং আগুনের আংটাবিদ্ধ করবে।

তখন ইবলিস-শয়তান আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী শাস্তি ও মরণ-যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে।

তখন আদম ও হাওয়াকে বলা হবে, তোমরা তোমাদের শত্রুর দিকে তাকিয়ে দেখো, কতো কঠিন বিপদের উপর আপতিত হয়েছে। মৃত্যুর কতো মর্মন্তুদ জ্বালা সে ভোগ করছে। তখন আদম ও হাওয়া আঃ উকি মেরে তাকিয়ে তার কঠিন শাস্তি ও মৃত্যুর-যন্ত্রণা অবলোকন করবে এবং বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের উপর আপনার নেয়ামত পরিপূর্ণ করেছেন।

যুগ যুগ ধরে পাপিষ্ঠদের মৃত্যু এমন নরক যন্ত্রণার মধ্যেই হয়ে থাকে। ফেরাউন, নমরুদ, কারুন ও আবু জাহেলদের মত যারাই দুনিয়াতে এসেছেন, তাদেরকে আল্লাহপাক বে-ইজ্জতির মৃত্যু দিয়েছেন।
আল্লাহপাক আমাদেরকে বে-ইজ্জতির মৃত্যু থেকে হেফাজত করুন। আমাদের সকলের মরণ-যন্ত্রণাকে সহজ করে দিন। ইবলিসের কুমন্ত্রণা থেকে বেচে আল্লাহপাকের হুকুম-আহকাম এবং তার মনোনীত রাসুল সাঃ এর উপর নাজিলকৃত জীবন-বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here