হজ্জ ও ওমরাহ্ এর ধারাবাহিক আলোচনা (পর্ব -৩)

হজ্জ ও ওমরাহ্ পর্ব -৩
এটি সম্পূর্ন হজ্জ ও ওমরাহ্ পর্ব-১ এবং হজ্জ ও ওমরাহ্ পর্ব-২ লেখাটির সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং বিষয়টা স্পষ্ট ভাবে বুঝতে হলে আপনাকে ঐ লেখাটিও অবশ্যই পড়তে হবে।

দ্রঃ বিষয়টা যেহেতু পূর্বের লেখার সাথে সম্পৃক্ত তাই পূরণায় কোন ভূমিকা কায়েম না করে সরাসরি ই লেখা শুরু করলাম।

যাইহোক, যাদের উপর হজ্জ ফরয হয়েছে, তারা সব ওয়াছওয়াছা বাদ দিয়ে হজ্জের নিয়ত করে নেই। মাতা-পিতা, আত্বীয়-স্বজন যাদের প্রতি আমাদের কিছু করনীয় আছে, তারা যদি হজ্জ ফরয হওয়ার পর হজ্জ না করে দুনিয়া থেকে চলে যেয়ে থাকেন, পারলে তাদের বদলী হজ্জের ব্যবস্থা করাই। বিশেষ ভাবে মাতা-পিতা যারা আমাদের জন্য সম্পদ রেখে গেছেন, তারা যদি হজ্জ ফরজ হওয়ার পর হজ্জ না করে মৃত্যুবরন করে থাকেন, তাহলে তাদের বদলী হজ্জ করানোর ব্যবস্থা করি। যদি তারা ওছিয়ত করে যেয়ে থাকেন,আর তারা সম্পদও রেখে গিয়ে থাকেন, তাহলে তো বদলী হজ্জ করানো ওয়ারিছের উপর ওয়াজিব। ওছিয়ত করে গিয়ে থাকলে যারা ওয়ারিছ তাদের উপরে এটা করানো ওয়াজিব হয়ে যায়।

যদি ওছিয়ত নাও করে থাকেন, তাহলেও তাদের চিন্তা করে দেখা দরকার যে , হজ্জ করা ফরজ, এই ফরজ আদায় না করার কারনে তাদের কবরে আযাব হতে পারে। যদি তাই ই হয়, তাহলে আমি সন্তান হয়ে কিভাবে এটা সহ্য করতে পারি? আমার সম্পদ আছে, আমি সম্পদ নিয়ে আরামে থাকব, আর তিনি কবরে আযাব ভোগ করতে থাকবেন তা কী করে আমি সহ্য করব? এরকম হলে সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় মাতা- পিতার বদলী হজ্জ করানোর ব্যবস্থা করা। যদি ওছিয়ত নাও করে থাকেন তবুও সামর্থ থাকলে সন্তান হিসাবে নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাড়াঁয় মাতা- পিতার বদলী হজ্জের ব্যবস্থা করা। আশা করা যায় বদলী হজ্জ করানো হলে তাদের ক্ষমার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। মাতা- পিতা আমাদের জন্য কিছু না কিছু রেখেই গিয়েছেন, তাই তাদের ব্যাপারে গাফেল হওয়া ঠিক নয়।
কবি বলেনঃ

تو تونگر گشتئ ازمال ما – ایں زماں غافل شدی ازحال ما

অর্থাৎ, মাতা- পিতা কবরে বসে সন্তানকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেনঃ তুমি আমার রেখে আসা সব কিছু দিয়েই স্বচ্ছল হয়েছ, অথচ আজ তুমি আমার কথা ভুলে গেছ!

হজ্জ বয়স থাকতেই করা দরকার। শরীরে শক্তি সামর্থ থাকতেই করা দরকার। দেখা যায় আমাদের পাক,ভারত, বাংলাদেশ- এই উপমহাদেশের মানুষরাই যখন দূর্বল হয়ে যায়, যখন বৃদ্ধ হয়ে যায়, তখন হজ্জ করতে যায়। কারন সারা জীবন তো হজ্জ করেননি, মনে করেছেন বয়স হোক তারপর হজ্জ করব, হজ্জ থেকে ফিরে এসে আর দুনিয়ার কোন কাজ করব না, শুধু আল্লাহ্ বিল্লাহ করতে থাকব। এর অর্থ হল হজ্জ করব এমন বয়সে যখন কমর বাকা হয়ে যাবে। যখন দুনিয়ার কোন কিছু করার ক্ষমতা আর থাকবে না, তখন হজ্জ করে এসে একেবারে ফেরেশতা হয়ে যাব। এখন হজ্জ করে আসলে হজ্জের র্মযাদা রক্ষা করতে পারবনা । হজ্জ করার পরও অনেক গোনাহের কাজ হয়ে যায়। তাই বয়স হলেই হজ্জ করব। অর্থাৎ- ভাবখানা এমন যে, বৃদ্ধ হওয়ার পর যখন আর গোনাহ করার ক্ষমতা থাকবে না, তখন হজ্জ করব। এভাবে একেবারে বৃদ্ধ হওয়ার পর তারা হজ্জ করতে যান।

অন্যান্য দেশের মানুষকে দেখা যায় হজ্জ ফরয হয়েছে, বয়স কম, তবুও তারা হজ্জ আদায় করে নিচ্ছে। আমাদের দেশের লোকেরা কি মনে করে যে, হজ্জ করার পর আর দুনিয়াবি কাজ-কাম করা যায় না? হজ্জ করার পর আর স্বাভাবিক জীবন-যাপন করা যায় না? আমি নাময পড়ার পর স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারি, আমি রোযা রাখার পর সাধারণ জীবন-যাপন করতে পারি, আমি যাকাত দেয়ার পর সাধারণ জীবন-যাপন করতে পারি, তাহলে হজ্জ করার পর কেন সাধারণ জীবন-যাপন করতে পারবো না?

হজ্জ করার পর সাধারণ জীবন-যাপন করা যাবে না, দুনিয়াবি কাজ-কাম করতে পারবনা এই ধারণাটা দিলো কে? এই সমস্ত ভ্রান্ত ধারণার শিকার হয়ে আমি হজ্জ না করে শারীরিক ভাবে যখন দূর্বলতার পর্যায়ে চলে আসি, তখন হজ্জ করতে যাই। শারীরিক ভাবে দূর্বল হয়ে গেলে হজ্জের কাজগুলো ঠিক মত আদায় করা যায় না। তখন আক্ষেপ হয় যে, হায়রে বয়স থাকতে কেন হজ্জে আসলাম না! তাই সব রকম ওয়াছওয়াছা ঝেড়ে ফেলে এখনই হজ্জের নিয়ত করা চাই।
হজ্জের নিয়ত হতে হবে সম্পূর্ন খালেস। কোন রকম মার্কেটিংয়ের নিয়ত, দেশ ঘোরার নিয়ত, বেড়ানোর নিয়ত- এসমস্ত নিয়ত রাখা যাবে না। নিয়ত হবে একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশী করা। হজ্জ হতে হবে আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন,

ولله علي الناس حج البيت من استطاع إليه سبيلا. (سورة آل عمران: ٩٧)

অর্থাৎ- মানুষের হজ্জ করা কর্তব্য আল্লাহর’ই উদ্দেশ্যে। যাদের সামর্থ আছে আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পৌঁছার, তাদের উপরই হজ্জ ফরয। এ আয়াতে কাদের উপর হজ্জ ফরয সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। সাথে-সাথে হজ্জের জন্য খালেস নিয়ত এর গুরুত্ব্যও বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন, সব রকম ভুল ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত করুন, সব কিছু সহীহ ভাবে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমিন!
আমাদের সকলের যেন হজ্জ নসিব হয় সবাই দুয়া করবোঃ

اللهم وفقنا زيارة الحرمين-

অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমাদেরকে মক্কা-মদিনা যিয়ারতের তাওফীন দান করুন! আমিন।।।

দ্রঃ হজ্জ ও ওমরাহ্ বিষয়টা তিনটি পর্বে লিখা হয়েছে। একটি অপরটির সাথে অনেকটাই মিল। একটা ব্যতিত অন্যটি বুঝা দুরুহ বিষয়। সুতরাং আগ্রহীদের প্রতি আবেদন ৩টি লিখাই পড়বেন।
জাযাকুমুল্লাহ্।

Previous articleহজ্জ ও ওমরাহ্ এর ধারাবাহিক আলোচনা (পর্ব -২)
Next articleদাওয়াত ও তাবলিগ নিয়ে প্রাথমিক কিছু পর্যালোচনা
নামঃ- নাজমুল হাসান সাকিব বিন মুজিবুর রহমান স্থায়ী ঠিকানাঃ- বাহেরবালী, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানাঃ- বসুন্ধরা, বারিধারা, ঢাকা ১২২৯ পড়াশোনাঃ- বাহেরবালী দারুল উলূম নূমানিয়া মাদরাসা, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। (নূরানী টু হেদায়াতুন্নাহ্) জামিয়াতুস সালাম মদিনাবাগ, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। (কাফিয়া-শরহে বেকায়া) মারকাজুল উলূম আল-ইসলামিয়া মান্ডা, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। আরবী স্নাতক ৪র্থ বর্ষ মদিনাতুল উলূম বসুন্ধরা মাদরাসা ( হেদায়া) মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা। (এম এ- মাস্টার্স) পেশাঃ- পড়াশোনা (ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনো অধ্যায়ণরত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here