Friday, July 12, 2024
No menu items!
Homeইসলামি শিষ্টাচারইসলামী শিষ্টাচার, দ্বীতিয় পর্ব-

ইসলামী শিষ্টাচার, দ্বীতিয় পর্ব-

৪. ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া…
ইসলামী শিষ্টাচার হচ্ছে, যখন আপনার পরিবারের কোন সদস্য তার কামরায় উপস্থিত থাকে আর আপনি তার কাছে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন, তখন সেখানে প্রবেশের পূর্বে তার কাছে আপনি অবশ্যই অনুমতি নিবেন। যাতে আপনি তাকে এমন অবস্থায় না দেখেন, যা সে অপছন্দ করে। অথবা আপনি পছন্দ করেন না তাকে এমন অবস্থায় দেখতে। হোক সে আপনার স্ত্রী কিংবা মাহরাম অথবা হোক সে আপনার মা বাবা, ভাই, বোন কিংবা অন্য যে কেউই হোক না কেন। সবার ক্ষেত্রে একই হুকুম।
হযরত ইমাম মালেক মুয়াত্তা -এ হযরত আতা ইবনে ইয়াসার সূত্রে বর্ণনা করেন-


عن عطاء بن يسار ان رسول الله صلى الله عليه وسلم: ساله رجل فقال استاذن يا رسول الله على امي؟ فقال 《نعم》 فقال: اني معها في البيت فقال: 《استاذن عليها》 فقال الرجل: اني خادمها فقال: 《اتحب ان تراها عريانة》 قال: لا قال: 《فاستاذن عليها》..

অর্থাৎ, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জিজ্ঞাসা করল, আমি কি আমার মায়ের নিকট ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি চাইব? রাসূল স. বললেন, হ্যাঁ! তখন সে আবার বলল আমি একই ঘরে তার সাথে থাকি ।
মহানবী স. বললেন, তবুও তার কাছে তুমি অনুমতি চেয়ে নেবে। লোকটি এবার আশ্চর্য হয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, আমি তো তার খাদেম।
রাসূল স. বললেন, তারপর ও তুমি তার কাছে অনুমতি নিয়ে সেখানে ঢুকবে । এবং বললেন, তুমি কি তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে চাও?
-সে বলল, না।
তখন রাসূল স. বললেন, তাহলে তুমি তোমার মায়ের অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করো না।

  • আদাবুল বায়হাক্বী: হাদিস নং ৬০২

এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর কাছে এসে বলল, আমার মায়ের নিকট যেতে কি আমার অনুমতি গ্রহন করতে হবে? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন নিশ্চয়ই তুমি তোমার মাকে সব ধরণের অবস্থায় দেখতে পছন্দ কর না! আর একজন মহিলা নানা রকম অবস্থায় থাকতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের সময়।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর স্ত্রী জয়নাব রা. বলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. যখন প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দরজার নিকটবর্তী হতেন, তখন স্ব- জোরে কাঁশি দিতেন । আমাদের কাছে অপছন্দনীয় অবস্থায় আগমন করা থেকে বিরত থাকার জন্য।


ইবনে মাজাহ শরীফের একটি রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ঘরে প্রবেশ করার প্রাক্কালে কাঁশি দিতেন ও শব্দ করতেন। জনৈক ব্যক্তি হুজাইফা ইবনে ইয়ামান রা. কে প্রশ্ন করল যে, আমি কি আমার আম্মার নিকট ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি চাইব? তিনি বললেন, তুমি যদি অনুমতি না চাও তাহলে তুমি তাকে এমন অবস্থায় দেখবে যা তুমি অপছন্দ করো।
সাহাবী তনয় মুসা ইবনে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা, বলেন, আমি আমার পিতার সাথে মার কাছে যাবার ইচ্ছা করলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমার মায়ের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমিও তার অনুসরণে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাত দ্বারা আমার বুকে আঘাত করে বসিয়ে দিলেন। এরপর রাগতঃস্বরে বললেন, কী ব্যাপার? অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করছ কেন?
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর বিশিষ্ট শাগরিদ তার আযাদকৃত দাস নাফে রহ. বলেন, ইবনে উমর রা. এর সন্তানদের কেউ যখন পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে যেতো, তখন তার জন্য পৃথক কামরার ব্যবস্থা করতেন। এরপর আর কখনো সে ইবনে উমর রা. এর অনুমতি ছাড়া তার ঘরে প্রবেশ করতে পারত না।


আল্লামা ইবনে জুরাইজ আতা ইবনে আবি রাবাহ- এর সূত্রে বর্ননা করেন যে, আমি ইবনে আব্বাস রাঃ কে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি আমার দুই সহোদরার বোনের গৃহে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি চাইব? তিনি বললেন, হ্যা! আমি তখন তাকে বললাম, তারা তো আমার ঘরেই থাকে! অর্থাৎ, আমার ঘরেই তাদের বাসস্থান। আমিই তাদের ব্যয়ভার বহন করি। তাদের সকল প্রয়োজন পূরন করি। তখন তিনি বললেন, তুমি কি তাদেরকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে চাও? এর পর তিনি কুরআনে কারীমের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে শুনালেন।


وإذا بلغ الأطفال منكم الحلم فليستاذنوا كما استأذن الذين من قبلهم –

অর্থাৎ, তোমাদের সন্তান-সন্ততি যখন বয়স্ক প্রাপ্ত হয় তখন তারা যেন অনুমতি প্রার্থনা করে। যেমন তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতি প্রার্থনা করেছে।

সূরা নূর: আয়াত নং ৫৯ ইবনে আব্বাস রা. বলেন এ আয়াতের নির্দেশ পালনার্থে সকল মানুষের উপর অনুমতি প্রার্থনা করা ওয়াজিব। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তি তার মা-বাবা, ভাই-বোনের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেই তার ঘরে প্রবেশ করবে।
হযরত জাবের রাঃ বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তি তার সন্তানের নিকট এবং তার মায়ের নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইবে। যদিও তিনি বৃদ্বা হোন না কেন। এমনি ভাবে অনুমতি চাইবে তার ভাই-বোন ও পিতার নিকট।
এই সমসস্ত রেওয়ায়েতের অধিকাংশই ইমাম বুখারী রহঃ তার সফররচিত গ্রন্থ আল আদাবুল মুফরাদের উল্লেখ করেছেন। আর এর কিছু কিছু রেওয়ায়েত প্রাগুক্ত আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে ইবনে কাসীর রহঃ স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

৫. দরজায় করাঘাত করার নিয়মাবলী….

ইসলামী শিষ্টাচার হলো, যখন আপনি আপনার ভাই, বন্ধু কিংবা আপনার পরিচিত কারো দরজায় কড়া নাড়বেন, তখন শুধু এতটুকু শব্দে কড়া নাড়বেন, যার মাধ্যমে একজন আগন্তুকের আগমন সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। অতি জোরে অত্যাচারী প্রহরীর ন্যায় কড়া নাড়বেন না। যদি এমনটি করেন তাহলে ঘরের লোকজন ভীত সন্ত্রস্ত হবে। আর তা হবে আপনার ভদ্রতা বহির্ভূত কাজ।
একদা দ্বীনের কোন ব্যাপারে জানার জন্য জনৈকা মহিলা হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর কাছে এলো, এবং দরজায় বিকট শব্দে করাঘাত করলো। তখন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বের হয়ে বললেন, এই ভাবে কড়া নাড়ে পুলিশ! কোন প্রশ্নকারী নয়! হুজুর স. এর সাথে শিষ্টাচার অক্ষুগ্ন রাখার জন্য তার সাহাবীগণ তার দরজায় গিয়ে আস্তে-আস্তে কড়া নাড়তেন।


এটি ইমাম বুখারী রহ. তাদীয় গ্রন্থ আল- আদাবুল মুফরাদে উল্লেখ করেছেন।
একেবারে আস্তে করাঘাত করাটা ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে দরজার নিকটে অবস্থান করছে। কিন্তু যে ব্যক্তি দরজা হতে সামান্য দূরে থাকে তার জন্য দরজায় এমন ভাবে করাঘাত করা উচিত, যাতে সে সেখানে থেকে আওয়াজ শুনতে পায়। তা ছাড়া এ হাদীসটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহানবী স. বলেছেন-

عن عائشة رضي الله عنها زوج النبي صلى ألله عليه وسلم قال: 《ان الرفق لا يكون في شيئ الا زانه ولا ينزع من شيء الا شانه》.

অর্থাৎ, কোন জিনিসের মধ্যকার কোমলতা কেবল তার সৌন্দর্যকেই বৃদ্ধি করে। পক্ষান্তরে কোন জিনিসের মধ্যকার কঠোরতা কেবল তার সত্তাকেই কলুষিত করে।
মুসলিম শরীফ 2/223

عن عبد الرحمن بن هلال عن جرير قال قال رسول الله صلى ألله عليه وسلم : 《من يحرم الرفق يحرم الخير كله》

অর্থাৎ, দরজায় দু’বার করাঘাতের মধ্যে বেশ কিছু সময় বিলম্ব করা উচিত। যাতে অজুরত ব্যক্তি অজু সম্পন্ন করতে পারে।
মুসলিম শরীফ 2/223

আর নামাযরত ব্যক্তি তার নামায ধীরে সুস্থে আদায় করতে পারে। এবং যে ব্যক্তি খাবার খাচ্ছে সেও যেন তার লোকমা খেয়ে অবসর হতে পারে। কোন কোন আলেম চার রাকাত নামায আদায় করতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় দুই করাঘাতের মাঝে বিলম্ব করতে বলেছেন, কারণ এমনও হতে পারে যে, দরজায় করাঘাত করার সামান্য পূর্বে নামায শুরু করা হয়েছে।
যখন তুমি এভাবে বিরতি দিয়ে তিনবার করাঘাত করলে এবং তোমার মনে হলো যদি সে ব্যস্ত না থাকতো তাহলে অবশ্যই সে দরজা
খুলে দিতো। তখন তুমি সেখান থেকে চলে আসবে। কেননা রাসূল সা. বলেছেন-

وقد قال رسول الله صلى ألله عليه وسلم : إذا استأذن أحدكم ثلاثا فلم يؤذن له فليرجع

অর্থাৎ, যখন তোমাদের কেউ তিনবার অনুমতি চায়, এরপরও তাকে অনুমতি দেয়া না হয়, তাহলে সে যেন ফিরে আসে।
বুখারী শরীফ 2/923 , মুসলিম শরীফ 2/210

যখন আপনি অনুমতি চাইবেন তখন দরজা বরাবর দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বরং ডান কিংবা বাম দিকের কোন একটি স্থানে দাঁড়িয়ে থাকবেন। কেননা আল্লাহর রাসূল সা. যখন কোন সম্প্রদায়ের ফটকের কাছে গমন করতেন, তখন ফটকের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতেন না। বরং তার ডান কিংবা বাম দিকে দাঁড়াতেন। আর এটিই শিষ্টাচার।

নাজমুল হাসান সাকীব
ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

আমাদের ফেসবুক পেজে এ যুক্ত হয়ে থাকতে পারেন এবং আমাদের কন্টেন্ট ভিডিও আকারে পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল টি সাবস্ক্রাইব করে রাখতে পারেন।

ইসলামী শিষ্টাচার প্রথম পর্ব

মুফতি নাজমুল হাসান সাকিব
মুফতি নাজমুল হাসান সাকিব
নাম: নাজমুল হাসান সাকিব পিতা: মুজিবুর রহমান স্থায়ী ঠিকানা: বাহেরবালী, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানা: বসুন্ধরা, বারিধারা, ঢাকা ১২২৯ পড়াশোনাঃ- বাহেরবালী দারুল উলূম নূমানিয়া মাদরাসা, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। (নূরানী টু হেদায়াতুন্নাহ্) জামিয়াতুস সালাম মদিনাবাগ, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। (কাফিয়া-শরহে বেকায়া) মারকাজুল উলূম আল-ইসলামিয়া মান্ডা, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। (আরবী স্নাতক ৪র্থ বর্ষ) মদিনাতুল উলূম বসুন্ধরা মাদরাসা ( হেদায়া) মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা। (এম এ- মাস্টার্স) আল মারকাজুল ইসলামী বাংলাদেশ। (ইসলামি আইন ও গবেষণা বিভাগ) পেশা: লেখালেখি ও পড়াশোনা। (ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনো অধ্যায়ণরত)।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments