ইসলামী শিষ্টাচার-তৃতীয় পর্বঃ-

ইসলামী শিষ্টাচার-তৃতীয় পর্বঃ-

৬. আমি নয় বরং নাম বলা জরুরী…
আপনি আপনার ভাই, বন্ধু কিংবা অন্য কারো দরজায় কড়া নাড়লে সে যখন বলবে- “কে’? তখন তার উত্তরে সুস্পষ্টভাবে নাম বলবেন। আমি কিংবা একজন লোক অথবা আমি একজন মুসাফির এ জাতীয় কিছু বলবেন না। কেননা এরকম শব্দ আগন্তুকের পরিচয় দানে সহায়তা করে না।
আপনার এ কথা মনে করা ঠিক নয় যে, যার দরজায় আপনি করাঘাত করছেন, আপনার আওয়াজ তার নিকট পরিচিত। কেননা মানুষের আওয়াজ বিভিন্ন রকম হওয়ার কারণে তাতে অস্পষ্টতার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় একজনের কণ্ঠস্বর অন্য জনের অনুরুপ হয়ে থাকে।
এছাড়া যার দরজায় আপনি করাঘাত করছেন, সেই ঘরের সকলেই হয়তো আপনার আওয়াজ ও গতিবিধি চিনে না। অপরদিকে শ্রবণশক্তি বিভিন্ন শব্দের তারতম্য করার ক্ষেত্রে কখনো কখনো ভুলও করে থাকে। তাই মহানবী সা. আগন্তুকের “আমি” বলাকে অপছন্দ করেছেন।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. হযরত জাবের রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন-

قال سمعت جابر بن عبد الله رضي الله عنهما يقول: أتيت النبي صلى ألله عليه وسلم في دين كان علي أبي فدققت الباب فقال من ذا فقلت أنا فقال أنا أنا كأنه كرهما-

আমি নবী করীম সা. এর দরজায় করাঘাত করলে তিনি ভেতর থেকে বললেন ‘কে’?
তদুত্তরে আমি বললাম “আমি”। তখন নবিজী সা. দু’বার বললেন, “আমি! “আমি! যেন তিনি তা অপছন্দ করছিলেন। এ কারণেই মহানবী সা. এর সহচরবৃন্দকে যখন বলা হত, কে? তখন তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিজেদের নাম বলতেন।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. আবু জর রা. এর রেওয়ায়েত থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

عن أبي ذر رضي الله عنه قال: خرجت ليلة من الليالي فإذا رسول الله صلى ألله عليه وسلم يمشي وحده وليس معه إنسان قال فظننت أنه يكره أن يمشي معه أحد قال فجعلت أمشي في ظل القمر فالتفت فراني فقال من هذا قتل أبو ذر-

আমি একরাতে পায়চারি করার জন্যে বের হয়ে হঠাৎ প্রিয়নবী সা. -কে একাকী হাঁটতে দেখতে পেলাম। তখন আমিও তার অনুসরণে চাঁদের স্নিগ্ধ আলোতে হাঁটতে লাগলাম। রাসূল সা. আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কে” তুমি? আমি উত্তরে বললাম, আমি আবু জর!

  • বুখারী শরীফ হাদিস নং ৯৫
    ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ আলী রাঃ এর ভাগ্নি মহানবী সঃ এর চাচাতো বোন উম্মে হানী সূত্রে বর্ননা করেন। তিনি বলেন-

عن أم هاني رضي الله عنها انها: ذهبت إلي صلى ألله عليه وسلم يوم الفتح فوجدته يغتسل وفاطمة تستره بثوب فقال 《من هذا》 قلت ام هاني-

আমি একদিন মহানবী সঃ এর কাছে এমতা বস্থায় আসলাম যে, তিনি তখন গোসল করছিলেন। আর নবী কন্যা হযরত ফাতেমা রাঃ তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তিনি বললেন, কে? আমি বললাম, আমি উম্মে হানী!

  • বুখারী শরীফ 2/932, মুসলিম শরীফ 2/212

৭. সাক্ষাৎ করার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়াবলী…
যখন আপনি নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কারো সাথে সাক্ষাত করতে যাবেন অথবা পূর্বের নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার পর তার কাছে উপস্থিত হবেন, তখন সে আপনার সাক্ষাত করতে পারবে না বলে ওযর পেশ করলে আপনি তার ওযর মেনে নেবেন। কারণ সে তার ঘরের অবস্থা এবং পোষাক-পরিচ্চদের ব্যাপারে অপ্রস্তুত থাকতে পারে। অনেক সময় সাক্ষাত করার ক্ষেত্রে তার বিশেষ প্রতিবন্ধকতা থাকে। অথবা সাক্ষাত করতে গিয়ে এমন অসুবিধার সম্মুখীন হয়, যা সে মেনে নিতে পারে না। সুতরাং অসুবিধার সম্মুখীন হওয়া থেকে বাঁচার জন্য আপনার সাথে সাক্ষাত না করার অধিকার তার রয়েছে।
প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত কাতাদা ইবনে দিয়ামা সাদূসী বলেন,

ولا تقفن علي باب قوم ردوك عن بابهم فإن لك حاجات ولهم اشغالا وإنهم أولي بالعذر .

অর্থাৎ, তুমি ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকো না, যারা তোমাকে দরজা হতে ফিরিয়ে দিয়েছে। কেননা তাদের কাছে তোমার প্রয়োজন রয়েছে। অপরদিকে তাদের রয়েছে আপন-আপন কর্মব্যস্ততা। আর একথা সত্য যে, ওযর পেশ করার ব্যাপারে তারা তোমার চেয়ে অধিকতর হকদার।
ইমাম মালেক রহ. বলতেন, মুখ খুলে সবাই ওযর পেশ করতে পারে না। তাই অন্যের সাথে সাক্ষাত করার ক্ষেত্রে আকাবিরদের অভ্যাস এই ছিল যে, তারা যার সাথে সাক্ষাত করবেন, তাকে আগে থেকে এই মর্মে জিজ্ঞেস করে নিতেন যে, অমুক সময় আপনার সাথে সাক্ষাতে কোন অসুবিধা আছে কি? আর তারা এই পন্থা এজন্য অবলম্বন করতেন, যাতে ঐ ব্যাক্তির কোন অসুবিধা থাকলে সহজেই তিনি ওযর পেশ করতে পারেন, এ আদবের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এবং সাক্ষাত করতে পরিবারের কষ্ট দূর করার জন্য অনুমতি পার্থনা ও গৃহে প্রবেশ সংক্রান্ত আলোচনায়
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

وإن قيل لكم ارجعوا فارجعوا هو ازكي لكم

অর্থাৎ, যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও তাহলে ফিরে যেয়ো। এটি তোমাদের জন্য উত্তম।
সূরা নূর, আয়াত- ২৮

অসময়ে সাক্ষাতের কারণে যে বিপদে মানুষ পতিত হয়, পবিত্র কুরআনের উপরোক্ত আয়াত তা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। সে বিপদটি হলো যখন সাক্ষাত চাওয়ার মাধ্যমে ঐ ব্যক্তিকে জটিলতার সম্মুখীন করা হয় যে, ব্যক্তি এখনই তার সাথে সাক্ষাত করতে আগ্রহী নয়। ফলে সে ঘরে থাকা সত্ত্বেও , ঘরে নেই বলে মিথ্যা সংবাদ দিতে বাধ্য হয়। একারণে কোমলমতি শিশুরা এহেন খারাপ আচরণটি শেখে। অনেক সময় তার এমন ব্যবহারের কারণে দুশমনি ও পরস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। অন্তরে অন্যের প্রতি ঘৃণা বোধ করে। কুরআনী আদর্শ আমাদেরকে এই সমস্ত সমস্যাবলির সম্মুখীন হওয়া থেকে পরিত্রাণ দিয়েছে। যেহেতু যার সাথে সাক্ষাত করা হবে তাকে ওযর পেশ করার অনুমতি দিয়েছে এবং সাক্ষাতপ্রার্থীকে ওযর কবুল করতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআন দৃপ্ত কন্ঠে এই কথা বলেন-

وإن قيل لكم ارجعوا فارجعوا هو ازكي لكم.

অর্থাৎ, যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও তাহলে ফিরে যেয়ো। এটি তোমাদের জন্য পবিত্রতর।
-সূরা নূর, আয়াত- ২৮

Previous articleসালামের ক্ষেত্রে অনৈসলামিক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ। পর্ব-৬
Next articleইসলামী শিষ্টাচার-চতুর্থ পর্বঃ-
নামঃ- নাজমুল হাসান সাকিব বিন মুজিবুর রহমান স্থায়ী ঠিকানাঃ- বাহেরবালী, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানাঃ- বসুন্ধরা, বারিধারা, ঢাকা ১২২৯ পড়াশোনাঃ- বাহেরবালী দারুল উলূম নূমানিয়া মাদরাসা, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। (নূরানী টু হেদায়াতুন্নাহ্) জামিয়াতুস সালাম মদিনাবাগ, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। (কাফিয়া-শরহে বেকায়া) মারকাজুল উলূম আল-ইসলামিয়া মান্ডা, মুগদা, সবুজবাগ, ঢাকা। আরবী স্নাতক ৪র্থ বর্ষ মদিনাতুল উলূম বসুন্ধরা মাদরাসা ( হেদায়া) মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা। (এম এ- মাস্টার্স) পেশাঃ- পড়াশোনা (ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনো অধ্যায়ণরত)