মুক্তির দূত মহানবী সা.-এসো সিরাত পড়ি।

0
1446

মুক্তির দূত মহানবী সা. – এসো সিরাত পড়ি।

মুফতি ররফিকুল ইসলাম আল-মাদানী: প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে শান্তি ও মুক্তির দূত মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র জন্মের মাস রবিউল আউয়াল। এই মাস আমাদের কে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর এই ধরায় আগমনের শুভ সংবাদ দেয়। বয়ে আনে সকল মুমিনের অন্তরে অফুরন্ত আনন্দ। এই মাসে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) সুখ, শান্তি ও ঐক্য-সম্প্রীতির স্বর্গীয় সমাজ প্রতিষ্ঠার সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন এই পৃথিবীতে।

এসেছিলেন মহান আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার সুমহান দায়িত্ব নিয়ে।

তাই এ মাসে তাঁর আদর্শ অনুসরণই হবে আমাদের জন্যে আনন্দের মূল উৎস। তাঁর আদর্শ অনুসরণে ই কেবল দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো দাঁড়াতে পারে একটি জাতি। একমাত্র তাঁর অনুসৃত আদর্শই সর্বস্তরের মানবের ইহ ও পরকালের চিরকল্যাণ বয়ে আনতে পারে। উপহার দিতে পারে আনন্দময় জীবন, বিনয়ী ও আত্মত্যাগী মানব, শ্রেণিহীন-বৈষম্যহীন নির্মল স্বচ্ছন্দময় সমাজ। মদিনায় ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) তা সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন । প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কাহিনি, যুগের নামটাই ছিল অন্ধকার বা জাহেলি সমাজ।

মনুষ্যত্ববিবর্জিত বিশ্ববাসীর পাশবিক জীবনের ভয়াবহ বিভীষিকা ও তাদের অমানবিক তা-বলীলায় বিধ্বস্ত হচ্ছিল জগতের প্রতিটি অঞ্চল। নারীর ছিল না দাবি জানানোর সামান্যতম অধিকার। খুন, ধর্ষণ ছিল ওই সমাজে নিত্যদিনের খবর। নগণ্যতম বিষয় নিয়ে হানাহানি-মারামারি চলত যুগ যুগ ধরে। অসহায় মানবতার বুকফাটা রুদ্ধশ্বাসের মধ্য দিয়ে যেন প্রতিভাত হচ্ছিল,
 

বর্ণিত হয়েছে,

رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا (75)
‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের এ অত্যাচারী জনপদ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করুন! আর আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী পাঠান। ’ সুরা আন নিসা, আয়াত ৭৫।

সুখ-শান্তি, ঐক্য, সম্প্রীতি ও স্বচ্ছন্দময় স্বর্গীয় সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মহান প্রভু পাঠালেন মানবতার নবী মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-কে। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) ইসলামের অমৃত সুধা পৌঁছে দেন ঘরে ঘরে। ঘোর অমানিশা কাটিয়ে ঐশী জ্যোতিতে আলোকোজ্জ্বল করেছিলেন গোটা সমাজকে। নৈতিক অবক্ষয়ের চরম বিপর্যয় রোধ করে সুখ-শান্তিপূর্ণ একটি সমাজ উপহার দিয়েছিলেন তিনি।

তাঁর আনীত মহামুক্তির পয়গাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। শত বছরের নৈরাজ্যপূর্ণ ওই বিশ্বে প্রবাহিত হয়েছিল ঐক্য-সম্প্রীতি ও সুখ-শান্তির ফল্গুধারা। দলে দলে মানুষ এসে তাঁর পতাকাতলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে আরম্ভ করে। তাদের হানাহানি সেদিন রূপ নেয় ভালোবাসায়, কপটতা পাল্টে আসে উদারতা, নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানোর শিক্ষাও তারা পেয়েছিল। পেয়েছিল বিনয় ও আত্মত্যাগের পরম শিক্ষা। প্রতিশোধের পরিবর্তে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং ক্ষমা করার আদর্শ। শত বছরের শত্রুও সেদিন পরিণত হয়েছিল আপন বন্ধুতে।
রাসুলে খোদা মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) একদিকে ছিলেন দিশাহারা মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের খোদায়ী রাহবার। অন্যদিকে ছিলেন গণমানুষের মৌলিক চাহিদা, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবিধানকারী মহান রাষ্ট্রনায়ক- খলিফাতুল্লাহ। এমনিভাবে রণক্ষেত্রে ছিলেন সেনাধ্যক্ষ। সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ছিলেন নিবেদিত সমাজসেবী। পারিবারিক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় ছিলেন অসাধারণ গৃহকর্তা। মানবকল্যাণে তিনি ছিলেন দরদিপ্রাণ। এক কথায় জীবনের সব ক্ষেত্রে তিনি গড়েছিলেন আপামর বিশ্ববাসীর জন্য এক অনন্য আদর্শ। মানব জীবনের প্রতিটি মুহুর্তেই যার মডেল অনুসরণ করার মত।

যেখানে অন্যায় নেই, উগ্রতা নেই, শোষণ-নিপীড়ন নেই। নেই স্বজনপ্রীতি ও প্রতিশোধের জঘন্য প্রবণতা। আছে শুধু বিনয়, আত্মত্যাগের বিস্ময়কর কাহিনি, ধৈর্য-সহনশীলতার সচিত্র উদাহরণ। আর উদারতার নির্মল আদর্শ। মহান প্রভুর ঘোষণা-

 وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا 

‘আর তোমরা সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, এরপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। ’ সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩।

খুন, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, দুর্নীতি আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর আদর্শ এবং ইসলামের সোনালি অধ্যায় থেকে এ সমাজ দূরে- অনেক দূরে। মানবতার এ চরম বিপর্যয় ও বিড়ম্বনার ইতি টেনে চলমান বিশ্বে আবারও সুখ-শান্তির নীড় গড়ার লক্ষ্যে, খুন, গুম ও ধর্ষণমুক্ত একটি স্বর্গীয় সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলনে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই। নেই মুক্তির কোনো উপায়।

লেখক, গবেষক, কলামিষ্ট, যোগ্য আলেম-
মুফতি রফিকুল ইসলাম আল- মাদানী
-তাখাসসুস ফিত তাফসীর ওয়াল হাদিসের প্রধান ও মুহাদ্দিস ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here