শবেবরাতে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয় কাজ সমূহ।


শবেবরাত অনেক বরকতময় একটি রাত্র। এ রাত্রটি অনেক সহীহ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত তবে এ রাত্রকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে রুসম-রেওয়াজ প্রচলিত আছে যা শরীয়তের পরিপন্থী। আজেকে আমরা আমাদের করণীয় বিষয়গুলোকে দুইভাগ ভাগ করতে পারি।
১.আমাদের করণীয়গুলো/ আমাদের আমলগুলো কি?
২.আমাদের বর্জনীয় কাজ সমূহ/ বিধিনিষেধগুলে কি?

.আমাদের করণীয় বিষয়গুলো হলোঃ
প্রথমে আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে যে, তিনি এ বরকতময় রাতে কি আমল করেছেন। আর সেই আমলগুলো সহিহ হাদিসের আলোকে প্রমাণিত কিনা। কেননা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত বিষয়গুলো যয়িফ হাদিস থেকে বেশি আমলযোগ্য।
তাই আমরা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত আমলগুলো তুলে ধরবো।

এখানে শবে বরাতের (পনের শাবানের রাত) ফযীলত ও করণীয় বিষয়ক কিছু হাদীস যথাযথ উদ্ধৃতি ও সনদের নির্ভরযোগ্যতার বিবরণসহ উল্লেখ করা হল।

১ম হাদীস__

عن مالك من يخامر , عن معاذ بن جبل, عن النبى (, قال : يطلع الله الى خلقه فى ليلة النصف من شعبان, فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن ] رواه ابن حبان وغيره, ورجاله ثقات, وإسناده متصل غلى مذهب مسلم الذى هو مذهب الحمهورفى المعنعن, ولم يحزم الذهبى بأن مكحولالم يلق مالك بن يخامر كما زعم, وإنما قاله على سبيل الحسان, راجع ,سبر أعلام النبلاء

মুআয ইবনে জাবাল বলেন, নবী করীম স. ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত ও মাগফেরাতের দ্বারা ব্যপকভাবে উন্মুক্ত হয়। কিন্তু শিরকি কাজ-কর্মে লিপ্ত ব্যক্তি এবং অন্যের ব্যাপারে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারী মানুষ এই ব্যপক রহমত ও সাধারণ ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত থাকে। যখন কোন বিশেষ সময়ের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত ও মাগফেরাত ঘোষণা হয়, তখন তার অর্থ এই হয় যে, এই সময় এমন সব নেক আমলের ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফেরাতের উপযুক্ত হওয়া যায় এবং ঐ সব গুণাহ থেকে বিরত থাকতে হবে, যার কারণে আল্লাহ তাআলার রহমত ও মাগফেরাত থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

যেহেতু উপরোক্ত হাদীস এবং অন্যান্য হাদীসে অর্ধ-শাবানের রাতে ব্যাপক মাগফেরাতের ঘোষণা এসেছে, তাই এ রাতটি অনেক পূর্ব থেকেই শবে বরাত তথা মুক্তির রজনী নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। কেননা, এ রাতে গুনাহসমূহ থেকে মুক্তি লাভ হয় এবং পাপের অশুভ পরিণাম থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

হাদীসটির সনদ বা সূত্র বিষয়ক আলোচনা

উপরোক্ত হাদীসটি অনেক নির্ভরযোগ্য হাদীসের কিতাবেই নির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হিব্বান তার কিতাবু সহীহ এ (যা সহীহ ইবনে হিব্বান নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ, ১৩/৪৮১ এ) এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। এটি এই কিতাবের ৫৬৬৫ নং হাদীস। এ ছাড়া ইমাম বাইহাকী (রহঃ) শুআবুল ঈমান এ (৩/৩৮২, হাদীস ৩৮৩৩); ইমাম তাবরানী আলমুজামুল কাবীর ও আলমুজামুল আওসাত এ বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়াও আরো বহু হাদীসের ইমাম তাদের নিজ নিজ কিতাবে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।

হাদীসটির সনদ সহীহ। এজন্যই ইমাম ইবনে হিব্বান একে কিতাবুস সহীহ এ বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাসান বলেছেন; কিন্তু হাসান হাদীস সহীহ তথা নির্ভরযোগ্য হাদীসেরই একটি প্রকার।

এই রাতের আমল

উল্লেখিত হাদীস শরীফে এ রাতের কী কী আমলের নির্দেশনা-ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। নিম্নে এ বিষয়ে আরেকটি হাদীস পেশ করছি।

হযরত আলা ইবনুল হারিস (রহঃ) থেকে বর্ণিত, হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স) রাতে নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হল তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা অথবা বলেছেন, ও হুমাইরা, তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার এই আশংকা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা। নবীজী জিজ্ঞস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন ইরশাদ করলেন,

هذه ليلة النصف من شعبان ان الله عزو جل يطلع على عباده فى ليلة النصف من شعبان فيغفر للمستغفرينويرحمالمشترحمين ويؤخر اهل الحقد كماهم

‘এটা হল অর্ধ শাবানের রাত (শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তার বান্দার প্রতি মনযোগ দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।‘ [শুআবুল ঈমান, বাইহাকী ৩/৩৮২-৩৬৮]

ইমাম বাইহাকী (রহঃ) এই হাদীসটি বর্ণনার পর এর সনদের ব্যাপারে বলেছেন,

هذا مرسل جيد

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, এ রাতে দীর্ঘ নফল পড়া, যাতে সেজদাও দীর্ঘ হবে, শরীয়তের দৃষ্টিতে কাম্য। তবে মনে রাখতে হবে যে, অনেক অনির্ভরযোগ্য ওযীফার বই-পুস্তকে নামাযের যে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন লেখা আছে অর্থাৎ এত রাকআত হতে হবে, প্রতি রাকআতে এই সূরা এতবার পড়তে হবে – এগুলো ঠিক নয়। হাদীস শরীফে এসব নেই। এগুলো মানুষের মনগড়া পন্থা। সঠিক পদ্ধতি হল, নফল নামাযের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকআত করে যত রাকআত সম্ভব হয় পড়তে থাকা। কুরআন কারীম তেলওয়াত করা। দরূদ শরীফ পড়া। ইস্‌তেগফার করা। দুআ করা এবং কিছুটা ঘুমের প্রয়োজন হলে ঘুমানো। এমন যেন না হয় যে, সারা রাতের দীর্ঘ ইবাদতের ক্লান্তিতে ফজরের নামায জামাআতের সাথে পড়া সম্ভব হল না।

পরদিন রোযা রাখা সম্পর্কে
সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে__

عن على بن ابى طالب رضى الله عنه قال : قال رسول الله (() : إذا كانت ليلة النصف من شعبان فقوموا ليلها وصوموا نهارها, فإن الله ينزل فيها لغروب الشمس الى سماء الدنيا, فيقول : ألا من مستغفر فاغفر له على مستزرق فأرزقه, ألا مبتلى فأعافيه , ألا كذا, ألا كذا, حتى يطلع الفجر

হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মধ্য শাবানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোযা রাখ। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোন রিযিক প্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দেব। এভাবে সুব্‌হে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদের ডাকতে থাকেন। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৮৪]

এই বর্ণনাটির সনদ যয়ীফ। কিন্তু মুহাদ্দিসীন কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীস গ্রহণযোগ্য। তাছাড়া শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোযা রাখার কথা সহীহ হাদীসে এসেছে এবং আইয়ামে বীয অর্থাৎ প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোযা রাখার বিষয়টিও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

বলা বাহুল্য, পনের শাবানের দিনটি শাবান মাসেরই একটি দিন এবং তা আয়্যামে বীযের অন্তর্ভূক্ত। এজন্য ফিক্‌হের একাধিক কিতাবেই এদিনে রোযাকে মুস্তাহাব বা মাসনূন লেখা হয়েছে। আবার অনেকে বিশেষভাবে এ দিনের রোযাকে মুস্তাহাব বা মাসনুন বলতে অস্বীকার করেছেন।

এ রাতে অতিরিক্ত কিছু নফল ইবাদত ও দুআ করার ব্যাপারে আরও অনেক সালাফ ও ইমামের মত পাওয়া যায়। আমরা এখানে তাদের কয়েকজনের থেকে এ বিষয়ে মতামত উল্লেখ করছি।

ইবনে উমর রা. বলেন :
خَمْسُ لَيَالٍ لَا تُرَدُّ فِيهِنَّ الدُّعَاءَ: لَيْلَةُ الْجُمُعَةِ، وَأَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ رَجَبٍ، وَلَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَلَيْلَتَيِ الْعِيدَيْنِ
‘পাঁচ রাতের দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় না। এক. জুমআর রাতে। দুই. রজবের প্রথম রাতে। তিন. মধ্য শাবানের রাতে। চার. ইদুল ফিতরের রাতে। পাঁচ. ইদুল আজহার রাতে।’ (মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক : ৪/৩১৭, হা. নং ৭৯২৭, প্রকাশনী : আল-মাজলিসুল ইলমি, ভারত)

এসব হাদিস, আসার ও ফুকাহায়ে কিরামের উক্তি থেকে আমরা জানতে পারলাম, শবে বরাতে আমাদের জন্য নিম্নোক্ত আমলগুলো করা উচিত :
১. ইশার নামাজ জামাআতের সহিত আদায় করা।
২. সাধ্যমতো ঘরে একাকি নফল নামাজ পড়া।
৩. গভীর মনোযোগ সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করা।
৪. দুআ ও রোনাজারির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৫. কখনোসখনো সম্ভব হলে একাকি কবর জিয়ারত করা।
৬. ফজরের নামাজ জামাআতের সহিত আদয় করা

উপরোল্লিখিত যে আমলের ব্যাপারে বলা হয়েছে তা মনে প্রাণে পালন করার চেষ্টা করবো।

২. শবে বরাতে বর্জনীয় কাজসমূহঃ-

আমাদের সমাজে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে অনেক রুসুম ও রেওয়াজ চালু আছে, যার কোনোটিই শরিয়াহ সমর্থিত নয়। আমাদের এসব প্রথা ও প্রচলন থেকে বেঁচে থাকতে হবে। যেমন :
১. হালুয়া-মিষ্টি তৈরি করা।
শরিয়তে এর কোনোই ভিত্তি নেই। অনেকে মনে করেন, এদিন উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাঁত পড়ে গেলে তিনি হালুয়া-মিষ্টি খেয়েছিলেন। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এর কোনো প্রমাণ নেই। কেননা, উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শাওয়াল মাসে। তাছাড়া দাঁত শহিদ হওয়ার পর তিনি যে হালুয়া-মিষ্টি খেয়েছিলেন, এরও কোনো ভিত্তি নেই। তাই এটা ইসলামের নামে একটি কুপ্রথা, যা আমাদের অবশ্যই বর্জন করতে হবে।
মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ. বলেন :
ﺷﺐ ﺑﺮﺁﺕ ﮐﯽ ﺍﺗﻨﯽ ﺍﺻﻞ ﮨﮯ ﮐﮧ ﭘﻨﺪﺭﮨﻮﯾﮟ ﺭﺍﺕ ﺍﻭﺭ ﭘﻨﺪﺭﮨﻮﺍﮞ ﺩﻥ ﺍﺱ ﻣﮩﯿﻨﮯ ﮐﺎ ﺑﮩﺖ ﺑﺰﺭﮔﯽ ﺍﻭﺭ ﺑﺮﮐﺎﺕ ﮨﮯ ﮨﻤﺎﺭﮮ ﭘﯿﻐﻤﺒﺮ ﻧﮯ ﺍﺱ ﺭﺍﺕ ﮐﻮ ﺟﺎﮔﻨﮯ ﮐﯽ ﺍﻭﺭ ﺩﻥ ﮐﻮ ﺭﻭﺯﮦ ﺭﮐﮭﻨﮯ ﮐﯽ ﺭﻏﺒﺖ ﺩﻻﺋﯽ ﮨﮯ، ﺍﻭﺭ ﺍﺱ ﺭﺍﺕ ﻣﯿﮟ ﺁﭖ ﻧﮯ ﻣﺪﯾﻨﮧ ﮐﯽ ﻗﺒﺮﺳﺘﺎﻥ ﺟﺎﮐﺮ ﻣﺮﺩﻭﮞ ﮐﯿﻠﺌﮯ ﺑﺨﺸﺶ ﮐﯽ ﺩﻋﺎ ﻣﺎﻧﮕﯽ ﮨﮯ ﺍﺱ ﺳﮯ ﺯﯾﺎﺩﮦ ﺟﺘﻨﮯ ﺑﮑﮭﯿﮍﮮ ﻟﻮﮒ ﮐﺮﺭﮨﮯ ﮨﯿﮟ ﺍﺱ ﻣﯿﮟ ﺣﻠﻮﮮ ﮐﯽ ﻗﯿﺪ ﻟﮕﺎﺭﮐﮭﯽ ﮨﮯ ﺍﺱ ﻃﺮﯾﻘﮧ ﺳﮯ ﻓﺎﺗﺤﮧ ﺩﻻﺗﮯ ﮨﯿﮟ ﺍﻭﺭ ﺧﻮﺏ ﭘﺎﺑﻨﺪﯼ ﺳﮯ ﯾﮧ ﮐﺎﻡ ﮐﺮﺗﮯ ﮨﯿﮟ ﯾﮧ ﺳﺐ ﻭﺍﮨﯿﺎﺕ ﮨﯿﮟ .
‘শবে বরাতের এতটুকু ভিত্তি আছে যে, এ মাসের পনেরো তারিখ দিবরাত্রি মহাসম্মানিত ও বরকতময়। আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাত জেগে ইবাদত করার এবং দিনে রোজা রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। (সতর্কতা : পূর্বে গত হয়েছে যে, রোজা রাখার হাদিসটি এতই দুর্বল, যা আমল করার অনুপোযোগী। তাই এটা আমলযোগ্য নয়।) এ রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এছাড়া লোকজন যত সব ধুমধাম করছে, এতে হালুয়া-মিষ্টি সংযুক্ত করছে, তেমনিভাবে ফাতিহার প্রবর্তন করছে এবং খুব গুরুত্ব সহকারে এসব করছে; এগুলো সব গর্হিত ও মনগড়া।’ (বেহেশতি জেওর : ৬/২৯৬, প্রকাশনী : তাওসিফ পাবলিকেশন, লাহোর)
২. ভালোভাবে গোসল করা। প্রচলিত আছে যে, এ রাতে ভালোভাবে গোসল করলে গোসলের সাথে সকল গুনাহ ধুয়ে মুছে যায়।
এটাও সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি কথা। কুরআন-সুন্নাহয় এর কোনো ভিত্তি নেই। তাই এমন আকিদা-বিশ্বাস ও কর্ম থেকে সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকতে হবে। তবে হ্যাঁ, এমনিতেই গরম থেকে বাঁচার জন্য বা পাক-পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করতে কোনো বাধা নেই।
৩. বিশেষ পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট রাকআতে নামাজ পড়া।
এটাও ভিত্তিহীন একটি আমল। এ রাতে এমন বিশেষ কোনো নামাজ নেই। এমনিতেই নফল হিসাবে যা ইচ্ছা পড়তে পারবে, কিন্তু কোনো বিশেষ পদ্ধতি বা ধরণ যুক্ত করলে তা বিদআতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।
ইমাম নববি রহ. বলেন :
ﺍﻟﺼَّﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﻤَﻌْﺮُﻭﻓَﺔُ ﺑﺼﻼﺓ ﺍﻟﺮﻏﺎﺋﺐ ﻭﻫﻲ ﺛﻨﺘﻰ ﻋَﺸْﺮَﺓَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﺗُﺼَﻠَّﻰ ﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟْﻤَﻐْﺮِﺏِ ﻭَﺍﻟْﻌِﺸَﺎﺀِ ﻟَﻴْﻠَﺔَ ﺃَﻭَّﻝِ ﺟُﻤُﻌَﺔٍ ﻓِﻲ ﺭَﺟَﺐٍ ﻭَﺻَﻠَﺎﺓُ ﻟَﻴْﻠَﺔِ ﻧِﺼْﻒِ ﺷَﻌْﺒَﺎﻥَ ﻣِﺎﺋَﺔُ ﺭَﻛْﻌَﺔٍ ﻭَﻫَﺎﺗَﺎﻥِ ﺍﻟﺼَّﻠَﺎﺗَﺎﻥِ ﺑِﺪْﻋَﺘَﺎﻥِ ﻭَﻣُﻨْﻜَﺮَﺍﻥِ ﻗَﺒِﻴﺤَﺘَﺎﻥِ
‘সালাতুর রাগায়িব নামে যে প্রসিদ্ধ নামাজ আছে, যা রজবের প্রথম জুমআয় মাগরিব ও ইশার নামাজের মাঝে বারো রাকআত করে পড়া হয়, অনুরূপ শবে বরাতের একশ রাকআত বিশেষ নামাজ; উভয়টিই বিদআত ও চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত।’ (আল মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব : ৪/৫৬, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)
৪. মৃতদের আত্মা বাড়িতে আসা এবং সবাইকে দেখে যাওয়া।
এটা মূলত হিন্দুদের আকিদা-বিশ্বাস। মৃত্যুর পর রুহ কখনো ফিরে আসে না। হয় সে ইল্লিয়্যিনে থাকে নয়তো সিজ্জিনে। বাড়িতে এভাবে আত্মা ফিরে আসার হিন্দুয়ানি আকিদা-বিশ্বাসের দ্বারা ইমানের ভয়ানক ক্ষতি হয়। তাই এমন বিশ্বাস অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
ﻭَﺣَﺮَﺍﻡٌ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﺮْﻳَﺔٍ ﺃَﻫْﻠَﻜْﻨَﺎﻫَﺎ ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﻟَﺎ ﻳَﺮْﺟِﻌُﻮﻥَ
‘যেসব জনপদকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, তার অধিবাসীদের ফিরে না আসা অবধারিত।’ (সুরা আল-আম্ব িয়া : ৯৫)
শাইখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ বলেন :
ﺍﻹﻧﺴﺎﻥ ﺇﺫﺍ ﻣﺎﺕ ﻳﻐﻴﺐ ﻋﻦ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﺤﻴﺎﺓ ﻭﻳﺼﻴﺮ ﺇﻟﻰ ﻋﺎﻟﻢ ﺁﺧﺮ ، ﻭﻻ ﺗﻌﻮﺩ ﺭﻭﺣﻪ ﺇﻟﻰ ﺃﻫﻠﻪ ﻭﻻ ﻳﺸﻌﺮﻭﻥ ﺑﺸﻲﺀ ﻋﻨﻪ ، ﻭﻣﺎ ﺫﻛﺮ ﻣﻦ ﻋﻮﺩﺓ ﺍﻟﺮﻭﺡ ﻟﻤﺪﺓ ﺃﺭﺑﻌﻴﻦ ﻳﻮﻣﺎ ﻓﻬﻲ ﻣﻦ ﺍﻟﺨﺮﺍﻓﺎﺕ ﺍﻟﺘﻲ ﻻ ﺃﺻﻞ ﻟﻬﺎ
‘মানুষ যখন মারা যায় তখন সে এ জগত থেকে পুরোপুরি বিদায় নিয়ে অন্য জগতে চলে যায়। তার রুহ পরিবারের কাছে ফিরে আসে না এবং তার পরিবারও এ সম্পর্কে কিছু অনুভব করতে পারে না। মৃত্যুর চল্লিশদিন পর রুহ ফিরে আসার যে কথা প্রচলিত আছে, তা পুরোই অনুমাননির্ভর, যার কোনো ভিত্তি নেই।’ (ইসলাম কিউএ ডট ইনফো : ফতোয়া নং ১৩১৮৩)
৫. মসজিদে বয়ান করা ও কাঁথা-কম্বল নিয়ে মসজিদে গিয়ে সবাই একসাথে রাত জাগা।
এটাও একটি বিদআতি আমল। নফল কাজে পরস্পরে ডাকাডাকি, গুরুত্বারোপ ও একত্রিত হওয়া জায়িজ নেই; বরং তা একাকি ও নির্জনে করা নিয়ম। তাই এসব কর্ম থেকেও বিরত থাকতে হবে।
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. বলেন :
ﻭﺍﻟﺜﺎﻧﻲ ﺍﻧﻪ ﻳﻜﺮﻩ ﺍﻻﺟﺘﻤﺎﻉ ﻓﻴﻬﺎ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺴﺎﺟﺪ ﻟﻠﺼﻼﺓ ﻭ ﺍﻟﻘﺼﺺ ﻭ ﺍﻟﺪﻋﺎﺀ ﻭﻻ ﻳﻜﺮﻩ ﺍﻥ ﻳﺼﻠﻲ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﻓﻴﻬﺎ ﻟﺨﺎﺻﺔ ﻧﻔﺴﻪ ﻭ ﻫﺬﺍ ﻗﻮﻝ ﺍﻻﻭﺯﻋﻲ ﺍﻣﺎﻡ ﺍﻫﻞ ﺍﻟﺸﺎﻣﻲ ﻭ ﻓﻘﻴﻬﻬﻢ ﻭ ﻋﺎﻟﻤﻬﻢ ﻭ ﻫﺬﺍ ﻫﻮ ﺍﻻﻗﺮﺏ ﺍﻥ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ
‘আর দ্বিতীয় মত হলো, এ রাতে নামাজ, ওয়াজ ও দুআর জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়া মাকরুহ। তবে একাকি নিজে নিজে এ রাতে নামাজ পড়লে তা মাকরুহ হবে না। এটাই ইমাম আওজায়ি রহ.-এর মত, যিনি সিরিয়ার ইমাম, ফকিহ ও আলিম। আর এ মতটিই ইনশাআল্লাহ অধিক সঠিক।’ (লাতাইফুল মাআরিফ : পৃ. ১৩৭, প্রকাশনী : দারু ইবনি হাজাম)
মুল্লা আলি কারি রহ. আল্লামা তিবি রহ. থেকে নকল করে বলেন :
ﻣَﻦْ ﺃَﺻَﺮَّ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻣْﺮٍ ﻣَﻨْﺪُﻭﺏٍ، ﻭَﺟَﻌَﻠَﻪُ ﻋَﺰْﻣًﺎ، ﻭَﻟَﻢْ ﻳَﻌْﻤَﻞْ ﺑِﺎﻟﺮُّﺧْﺼَﺔِ ﻓَﻘَﺪْ ﺃَﺻَﺎﺏَ ﻣِﻨْﻪُ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺈِﺿْﻠَﺎﻝِ ﻓَﻜَﻴْﻒَ ﻣَﻦْ ﺃَﺻَﺮَّ ﻋَﻠَﻰ ﺑِﺪْﻋَﺔٍ ﺃَﻭْ ﻣُﻨْﻜَﺮٍ؟
‘যে ব্যক্তি মুসতাহাব কাজে বাড়াবাড়ি করবে এবং এটাকে এমনভাবে আবশ্যক করে নেবে যে, রুখসতের ওপর আমলই করে না, তাহলে তাকে শয়তান গোমরাহিতে নিপতিত করেছে। তাহলে যে ব্যক্তি কোনো বিদআত বা শরিয়া পরিপন্থী কাজের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে, তার ব্যাপারটি কত ভয়াবহ?! (মিরকাতুল মাফাতিহ : ২/৭৫৫, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)
৬. কবরস্থানে মোমবাতি জ্বালানো ও মসজিদ আলোকসজ্জা করা।
এটাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ, শরিয়তে যার কোনোই ভিত্তি নেই। তাছাড়া এতে অনর্থক কাজে অনেক অর্থের অপচয় হয়, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ। তাই এ থেকে আমাদের পুরোপুরি দূরে থাকতে হবে।
আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি রহ. বলেন :
ﻭَﻓِﻲ ﺍﻟْﻘُﻨْﻴَﺔِ ﻭَﺇِﺳْﺮَﺍﺝُ ﺍﻟﺴُّﺮُﺝِ ﺍﻟْﻜَﺜِﻴﺮَﺓِ ﻓِﻲ ﺍﻟﺴِّﻜَﻚِ ﻭَﺍﻟْﺄَﺳْﻮَﺍﻕِ ﻟَﻴْﻠَﺔَ ﺍﻟْﺒَﺮَﺍﺀَﺓِ ﺑِﺪْﻋَﺔٌ ﻭَﻛَﺬَﺍ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤَﺴَﺎﺟِﺪِ
‘আল-কুনইয়া গ্রন্থে আছে, শবে বরাতের সময় বাজার, অলিগলি, এভাবে মসজিদে বিভিন্ন ধরনের আলোকসজ্জা করা বিদআত। (আল-বাহরুর রায়িক : ৫/২৩২, প্রকাশনী : দারুল কিতাবিল ইসলামি, বৈরুত)

সারকথা ;
সহীহ হাদীসের আলোকে আমরা বুঝতে পারলাম যে এ রাতটি হলো আমলের রাত। তাই এ রাতে আমরা বেশী বেশী নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকারে থাকবো।

আর আমাদের সমাজে শবে বরাত নিয়ে যে বাড়াবাড়ি ও উন্মাদনা রয়েছে, তা কোনোটিই শরিয়াহ-সমর্থিত ও অনুমোদিত নয়। আল্লাহ আমাদের সঠিক ও সুসাব্যস্ত বিধানানুসারে আমল এবং ভুল ও বিদআতমূলক কাজসমূহ থেকে নিবৃত্ত থাকার তাওফিক দান করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here